ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক লীগে খেলা এবং তিন ফরম্যাটে বিশেষজ্ঞ দল গঠন প্রসঙ্গ

প্রকাশিত: ৪:৫৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১

ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক লীগে খেলা এবং তিন ফরম্যাটে বিশেষজ্ঞ দল গঠন প্রসঙ্গ

বাংলাদেশ ক্রিকেটের একজন শুভাকাঙ্খী হিসেবে আমি সব সময়ই খেলাটা দেখার পাশাপাশি জয় পরাজয় নিয়ে কথা বলি। ভালো-মন্দ দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করি। আমাদের ক্রিকেটের স্ট্রাকচার কিংবা দল নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং পরিকল্পনা বিষয়েও নিজের মতামত দেয়ার চেষ্টা করি। এক সময় শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ওয়াল কিংবা খেলাধূলার গ্রুপগুলোতে বলার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতেও সময় হলে লেখি খেলা বিষয়ে।

 

 

এমনিতে খেলার জয় পরাজয় নিয়ে কথা বলার বাহিরে আমি আমার লেখায় দুটি বিষয়কে খুব গুরুত্ব দেই। এক. ফরম্যাটভিত্তিক আলাদা দল গঠন করা এবং ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোর উন্নয়ন বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্রিকেটারদের খেলার সুযোগ বাড়িয়ে যেনো ভিনদেশী লীগে খেলার জন্য তৈরী করা যায়, সে বিষয় নিয়ে কথা বলি।

 

 

উল্লেখিত দুটো বিষয়ই বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য বেশ জরুরী। খেলাধূলার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি ও দেশের সম্মান, দুটোই জড়িত। আর দুটোর জন্যই বিদেশী লীগে খেলা এবং ফরম্যাটভিত্তিক দল গঠন গুরুত্বপূর্ণ। সে বিষয়েই আমার ক্ষুদ্র মস্তিস্কের ভাবনাগুলো বলতে চাই।

 

 

বাংলাদেশ দলের বর্তমান কারোরই অজানা নয়। ওয়ানডেতে আমাদের পারফরম্যান্সের গ্রাফ উধ্বমুখী হলেও টেস্টে পূর্বের চেয়েও আরো খারাপ অবস্থা যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে। টি২০ ফরম্যাটে মন্দের ভালো। ততটা খারাপও নয়। আবার এগিয়ে যাওয়াও হচ্ছে না। বিশেষ করে পাওয়ার ক্রিকেটে আমাদের অবস্থা আফগানিস্তানের চেয়েও অনেক (পিছিয়ে) দূরে।

 

 

২০১৭ সালে জাতীয় দুটি দৈনিক ফরম্যাট ভিত্তিক দল গঠন করা বিষয়ে লেখেছিলাম। পাঠকদের জন্য পেপার কাটিং শেয়ার করেছি লেখাটির নিচে। একই ভাবে ক্রিকেটের কাঠামোগত উন্নতির মাধ্যমে বিদেশী লীগগুলোতে যেনো বেশি বেশি ক্রিকেটারদের খেলার সুযোগ করে দেয়া যায়। প্রবাসীদের মতো ক্রিকেটের মাধ্যমেও যেনো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত লেখেছি আরেকটি জাতীয় দৈনিক। পাঠকদের জন্য পেপার কাটিং শেয়ার করেছি লেখাটির নিচে।

 

বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নতির জন্য তিন ফরম্যাটে দল গঠন বেশ জরুরী। ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট অনেকের ভাষায় এখনো সেই পর্যায়ের দল হয়ে উঠেনি বাংলাদেশ যে, ফরম্যাটভিত্তিক দল গঠন করা যাবে অর্থাৎ সাকিব-তামিম-মুশফিক-রিয়াদ, মুস্তাফিজ-সৌম্য-লিটনরাই তিন ফরম্যাটে খেলে, কিন্তু বিশেষজ্ঞ দল গঠন করতে গিয়ে তাদেরকে কোন ফরম্যাটে বসিয়ে/বাদ দেওয়ার মতো দল এখনো হয়নি বাংলাদেশ। যদি এটিই আসল কারণ হয় ফরম্যাটভিত্তিক দল না করার জন্য, তাহলে বলতে হয় এ পর্যন্ত একই দল দিয়ে তিন ফরম্যাট খেলানোর পরও উন্নতি নেই বাংলাদেশের বরং অবনতি হচ্ছে টেস্ট ও টি২০ ফরম্যাটে। ফলে ভবিষ্যতের জন্য ফরম্যাটভিত্তিক দল গঠনের সিদ্ধান্তটাই এখন নিতেই হবে।

 

 

ভিনদেশী লীগে বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের সুযোগ না হওয়ার পেছনে একটাই কারন টি২০ ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান মজবুত নয়। দেশের সফলতা কম মানে ক্রিকেটারদের সফলতাও কম। ফলে এক সাকিব কিংবা সাথে মুস্তাফিজ ছাড়া আইপিএলে কারো সুযোগ হয় না। বিগব্যাশে দল পায় না কেউ (সাকিব পূর্বে খেলেছে একাধিকার) পিএসএল, সিপিএল কিংবা এই মানের লীগগুলোতে বড়জোর ২/৪জনের সুযোগ হয়। যদিও টি১০ লীগে ৭ ক্রিকেটার খেলেছে সদ্য সমাপ্ত আসরে। যা যেকোন লীগে সর্বোচ্চ বাংলাদেশী ক্রিকেটার খেলার রেকর্ড।

 

 

বিশ্বের বড় বড় দলগুলোতে ফরম্যাটভিত্তিক দল আছে। তিন ফরম্যাটের মধ্যে টেস্টের ক্রিকেটাররা বেশি বেতন ও মূল্যায়ণ হয় বোর্ড থেকে। প্রত্যেকটি দলে কয়েকজন ক্রিকেটার থাকে, যারা তিন ফরম্যাটেই খেলে নিয়মিত/সাময়িক বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে। বাংলাদেশেও আছে কয়েকজন ক্রিকেটার যারা, তিন ফরম্যাটেই খেলছে বহু বছর ধরে। যাদের মধ্যে সাকিব-তামিম, মুশফিক-রিয়াদ অন্যতম। বিগত ৫ বছর ধরে সৌম্য, লিটন, মুস্তাফিজ, মিরাজ, কায়েস (এখন নেই) খেলছে তিন ফরম্যাটে। বাংলাদেশ দলে একমাত্র টেস্টেই বিশেষজ্ঞ ক্রিকেটার হিসেবে খেলেন মুমিনুল হক। মুমিনুল যেমন শুধুমাত্র টেস্টেই ফোকাস রাখেন, তেমনি অভিষেকের পর থেকে মোমিনুলই দেশের সেরা টেস্ট ক্রিকেটার। তামিম-মুশফিকদের ৫/৬ বছর পর টেস্ট দলে এসেও এখন সর্বোচ্চ শতক ও সর্বোচ্চ এভারেজ মোমিনুলের।

 

 

প্রত্যেক দলে যেমন ৫/৬ জন ক্রিকেটার থাকে যারা সব ফরম্যাটেই খেলার যোগ্যতা রাখে এবং ভালো খেলে। তেমনি বাংলাদেশেও আছে, এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোর মান বৃদ্ধির মাধ্যমে হোম সিরিজে কেমন উইকেট হবে এবং অ্যাওয়ে সিরিজে কেমন উইকেট হবে, সেসব বিবেচনায় ঘরোয়া উইকেট তৈরী করা এবং ক্রিকেটার গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে বিসিবিকে। ফরম্যাটে ভিত্তিক দল গঠন করার ফলে একজন ক্রিকেটার তার প্রিয় ফরম্যাটটিতে সুযোগ পেলে ফোকাসটা শুধু এখানেই রাখতে পারবে। যেমনটা মুমিনুল এখন দেশের অন্যতম সেরা টেস্ট প্লেয়ার।

 

ফরম্যাটভিত্তিক দল গঠনের ফলে যারা ওয়ানডে ও টি২০ দলে খেলবে শুধু। তাদের মধ্য থেকেই হার্ডহিটার ক্রিকেটার উঠে আসবে। পেস/স্পিনে ভালো ক্রিকেটার উঠে আসবে। যাদের মাধ্যমে উপকৃত হবে দেশ এবং যারা ভালো খেলার মাধ্যমে বিদেশী লীগেও সুযোগ করে নিতে পারবে কিংবা এমন অনেক ক্রিকেটার তৈরী হবে, যারা জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়ার আগে কিংবা দলের বাহিরে থাকার সময়ও বিদেশী লীগে খেলতে পারবে, যেমনটা উইন্ডিজ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান সহ বহু দেশের ক্রিকেটাররাই ফ্রাঞ্চাইজিলীগগুলোতে খেলার মাধ্যমে নিজেদের পারফরম্যান্সের উন্নতির পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটাচ্ছে।

 

ফ্রাঞ্চাইজি লীগ কিংবা ফরম্যাটভিত্তিক দলের আলোচনায় সাকিবের প্রসঙ্গেও আসতে হচ্ছে। সম্প্রতি টেস্ট সিরিজ থেকে ছুটি নিয়েছেন সাকিব আল হাসান আইপিএলে খেলার জন্য। সাকিবের সমালোচনা হচ্ছে সে দেশের হয়ে খেলা থেকে ছুটি নেওয়ায়। সমালোচনাটা এক অর্থে সঠিক মনে হলেও বুঝতে হবে সাকিব আল হাসান খেলতেই হাচ্ছেন, ঘুরতে নয়। সাকিবের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা, তার বিকল্প গড়তে না পারা কিংবা ফরম্যাট ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ দল নেই বলেই একজন সাকিবের অনুপস্থিতিতে যায় যায় অবস্থা হয়ে যায় বাংলাদেশ ক্রিকেটের। এটি সাকিবের কারনে নয়, বরং বোর্ডের কারনেই হয়েছে। ফরম্যাটভিত্তিক দল থাকলে এবং যোগ্য ব্যাকাপ ক্রিকেটার থাকলে কোন একজনের না থাকাতে দলের ক্ষতি কিংবা বিশেষ প্রভাব পরতো না, যেমনটা পরছে এখন। এর মূল কারন ফরম্যাটভিত্তিক বিশেষজ্ঞ দল না থাকা এবং ব্যাকাপ ক্রিকেটার না থাকা।

 

সাকিবের আইপিএল প্রসঙ্গ বাদ দিলেও বিশ্বের অনেক দলই সিরিজ বুঝে বুঝে তাদের বহু ক্রিকেটারকে বিশ্রামে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ দল অস্ট্রেলিয়ার সাথেও যাদের খেলায়, জিম্বাবুয়ের সাথেও তাদেরই খেলায়। সিরিজের প্রথম ম্যাচেও যে একাদশ থাকে, তৃতীয় ম্যাচেও একই একাদশ বা ১টি পরিবর্তন আনা হয়। খর্ব শক্তির কোন দলের সাথে খেললেও আমরা আমাদের সেরা দল গঠন করি, যে বুলি আওড়ানো দরকার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেললে, সেই একই বুলি আওড়াই জিম্বাবুয়ের সাথে খেললেও। ফলে আমাদের ব্যাকাপ ক্রিকেটার তৈরী হয় না, ফরম্যাটভিত্তিক দল গঠন করার প্রাথমিক চেষ্টাটাও করা হয়নি এতোদিনে। আমি মনে করি আমরা এখনো একই জায়গায় কিংবা সাম্প্রতি সময়ের মতো পিছিয়ে যাওয়ার এগুলোই বড় কারণ।

 

ফরম্যাটভিত্তিক দল গঠনের মাঝে যেমন দেশের ক্রিকেট এগিয়ে যাওয়ার রহস্য লুকিয়ে আছে, তেমনি বিদেশী লীগে অবস্থান গড়ে নেওয়ার বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। একই ক্রিকেটারকে সব ফরম্যাটে না খেলিয়ে ফরম্যাটভিত্তিক দল গঠন করার মাধ্যমে শুরু থেকে খুব বেশি সফলতা না এলেও এর ভবিষ্যত ফলাফল দারুণ হবে। অন্তত টি২০ ফরম্যাটটা দিয়ে শুরু করতে হবে। এমনিতেই আমরা টেস্টে কিংবা টি২০ ফরম্যাটে খুব বেশি সফলতা পাই না, তাই এই দুইটি ফরম্যাটে ভবিষ্যতের কথা ভেবে সাজাতে পারলে দূর্দান্ত হবে ভবিষ্যতের জন্য। এভাবে ধীরে ধীরে তিন ফরম্যাটেই একটি করে দল দাঁড়িয়ে যাবে। প্রয়োজনে এদের মধ্য থেকেই কারো পরিবর্তনে নির্দিষ্ট ফরম্যাটে সুযোগ দেয়া যাবে এবং সেরা পারফর্ম আদায় করা যাবে। যেমনটা করছে অন্যান্য দলগুলোও।

 

ফরম্যাটভিত্তিক দল গঠন করতে না পারলে আমাদের নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবে সাকিব কিংবা হাতেগুণা কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটারের উপরই, যার ফলাফল কেমন হতে পারে তা আমরা হারে হারে টের পাচ্ছি এখন থেকেই। তাই বাংলাদেশকে ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে এবং বেশি বেশি ক্রিকেটার গড়ে তোলতে কাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি ফরম্যাটভিত্তিক বিশেষজ্ঞ দল গঠন করার কোন বিকল্প নেই।

 

 

জুবায়ের আহমেদ

প্রাবন্ধিক ও ক্রীড়া লেখক