বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও প্রতিষ্ঠার গৌরবময় ইতিহাস

প্রকাশিত: ৫:৩৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২১

বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও প্রতিষ্ঠার গৌরবময় ইতিহাস

জুবায়ের আহমেদ:

বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশ থেকে। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশে ইন্দো একটি ভূখন্ড ও ইউরোপীয় একটি ভূখন্ড বিভক্ত হওয়াই এই ভাষাবংশ টিকে দুটি শাখাতে ভাগ করা হয়। একটি হচ্ছে “শতম” ও আরেকটি “কেন্তুম”। ভারতের মধ্যে “শতম” শাখায় কথা বলা হতো এবং ইউরোপের মানুষেরা “কেন্তুম” শাখায় কথা বলতো। ভাষার এমন বিভিন্ন নামাকরণের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে কথা বলা এবং লেখা দুটো আলাদা হয়ে গেল। অঞ্চল ভিত্তিতে যে ভাষায় কথা বলা হত তাকে মুখের ভাষা বলা হয়, বইয়ের ভাষায় যাকে বলে “প্রাকৃত” ভাষা। মানুষ যে ভাষায় লিখিত অর্থাৎ লিখিত ভাষার নাম ছিল “সংস্কৃত”। মুখের ভাষা অর্থ প্রাকৃত। ভাষাকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হলো গৌড় অঞ্চলের যে ভাষায় কথা বলা হত তাকে বলা হল “গৌড়ীয় প্রাকৃত” এবং মগধ নামে যে এলাকা ছিল তারা যে ভাষায় কথা বলতো সেটির নাম ছিল “মাগধী প্রাকৃত”।

 

সুনীতিকুমারের মতে বাংলা ভাষা এসেছে “মাগধী প্রাকৃত” থেকে দশম শতাব্দীতে। ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে “গৌড়ীয় প্রাকৃত” থেকে বাংলা ভাষায় এসেছে সপ্তম শতাব্দীতে। বাংলা ব্যাকরণে সুনীতিকুমারের কথাকে বেশি প্রাাধান্য দেওয়া হয়। সুনীতিকুমারের মতে “মাগধী প্রাকৃত” হোক বা মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে “গৌড়ীয় প্রাকৃত” একসময় এই ভাষাটি বিকৃতি হয়ে যায়। ভাষা যখন ব্যর্থ হয় তখন সেটাকে বলা হয় “অপভ্রংশ”। এই বিকৃতি ভাষা থেকে সরাসরি একটি ভাষার উৎপন্ন হয় “বঙ্গকামরূপী”। “বঙ্গকামরূপী” যেটি “অপভ্রংশের” একটি রূপ। এখান থেকে সরাসরি কিছু ভাষা তৈরি হয় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাংলা, এরমধ্যে আবার আছে অসমীয়া যা বর্তমানে আসামের ভাষা, আরো আছে উড়িষা ভাষা যেটা উড়িষ্যাতে কথা বলা হয়। তথ্যসূত্র-অনলাইন।

 

১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তান, আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিম বঙ্গের নাগরিকদের ভাষা বাংলা হলেও বিশ্বব্যাপী ভাষার আনুষ্ঠানিক কোন স্বীকৃতি ছিলো না। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। পাকিস্তান সরকারের এই ঘোষণার পর ক্ষোভ তৈরী হয় তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে, মেনে নিতে পারেনি পাকিস্তানের এমন সিদ্ধান্ত। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ৮ ফাল্গুন ১৩৫৮ বাংলা তথা ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রæয়ারীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্র এবং অনেক রাজনৈতিক কর্মী সহ সাধারণ নাগরিকরা বিক্ষোভ শুরু করে। পুলিশ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অজুহাতে আন্দোলনকারীদের উপর গুলিবর্ষণ করলে নিহত হয় রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার সহ আরো অনেকে, একাধিকজন আহত হয়। ২২শে ফেব্রæয়ারী শফিউর রহমান শফিক, রিক্সাচালক আউয়াল এবং এক কিশোর নিহত হয়। ২৩শে ফেব্রæয়ারী হরতাল পালন করা হয়। পাকিস্তান পুলিশের নির্মম হত্যাকান্ড ও নির্যাতনের প্রতিবাদে মুসলিম লীগ সংসদীয় দল থেকে একই দিনে পদত্যাগ করে। ছাত্রদের দ্বারা তৈরীকৃত শহীদ মিনার ২৪শে ফেব্রæয়ারী আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। একুশে ফেব্রæয়ারীতে শুরু হওয়া আন্দোলন চলমান থাকার ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪ সালের ৭ই মে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হয় এবং ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪নং অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

 

১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর বাংলাই হয় বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহারের নিশ্চিতের জন্য ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন জারী করা হয়। ১৯৯৮ সালের ২৯ মার্চ কানাডার বহুভাষিক ও বহুজাতিক মাতৃভাষা-প্রেমিকগোষ্ঠী জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” নামে একটি দিবস ঘোষণার প্রস্তাব উপস্থাপন করার ধারাবাহিকতায় তৎকালীন সরকারের শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক এর আন্তরিক প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় সকল বাধা পেরিয়ে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠন ইউনেস্কো কর্তৃক বাংলা ভাষা আন্দোলন ও বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান জানিয়ে একুশে ফেব্রæয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে “এখন থেকে প্রতি বছর একুশে ফেব্রæয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করবে জাতিসংঘ” এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাশ হয়েছে।

 

১৯৫২ সালে সালাম, বরকত, জব্বারদের তাজা রক্তের বিনিময়ে যে ভাষা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে আজ ইতিহাস না জানা এবং ইতিহাসকে তোয়াক্কা না করা প্রজন্ম বাংলা ভাষার বিকৃতিকরণ সহ বাংলা-ইংরেজীর মিশ্রনে কথা বলার অশুভ প্রচেষ্টায় লিপ্ত। এছাড়াও অনলাইন, ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন, সাইনবোর্ডে ভুল বানানে বাংলা লেখা হয়, শুদ্ধ বাংলা বানান আড়ালে থেকে যায়। বানান জানা মানুষ ভুল করে ফেললেও সংশোধন করে নেয় পরবর্তীতে। কিন্তু যারা শুদ্ধ বাংলা বানান সম্পর্কে অবগত নয়, তাদের ভুল সংশোধ হয় না। তাদের দ্বারা প্রতিনিয়ত ধর্ষিত হয় বাংলা ভাষা। বাংলার বিকৃত উচ্চারণ কিংবা অশুদ্ধ বানানে লিখে যারা তাদেরকে শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ে প্রদত্ত শিক্ষার মাধ্যমেই নয়, বাংলা ভাষার প্রতি নিবেদিত প্রাণ সকল মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা এবং শুদ্ধ বাংলা বলতে ও লিখতে আগ্রহী করে তোলার প্রচেষ্টার কোন বিকল্প নেই।

 

শিক্ষার্থী
ডিপ্লোমা ইন জার্নালিজম
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম)
কাটাবন, ঢাকা

 

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget
error: Content is protected !!