জাতীয় লীগ-বিসিএল-ঢাকা লীগে দল বৃদ্ধি প্রসঙ্গে

প্রকাশিত: ৫:৩৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১, ২০২১

জাতীয় লীগ-বিসিএল-ঢাকা লীগে দল বৃদ্ধি প্রসঙ্গে

জুবায়ের আহমেদ:

বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে আবিভর্‚ত হচ্ছে বাংলাদেশ। ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা লাভের পর ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ দল ইতিমধ্যেই ঘরের মাটিতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে সব দলের বিপক্ষেই। বিদেশের মাটিতে এক সময় শুধুমাত্র জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ভালো খেললেও ধীরে ধীরে উইন্ডিজ ও শ্রীলংকার বিপক্ষেও তাদের মাটিতে দূর্দান্ত বাংলাদেশ।

 

ক্রিকেটে প্রত্যাশিত উন্নতি না ঘটলেও বাংলাদেশের উন্নতির গ্রাফটা উর্ধ্বমূখী। দলে প্রতিদ্বন্ধিতা বাড়ছে। সেই সাথে নতুন ক্রিকেটার উঠে আসছে। ক্রিকেটে পা রাখছে তরুণরা। সন্তানকে ক্রিকেটার বানানোর স্বপ্নও দেখেন অভিভাবকরা। বাংলাদেশের মানুষের ক্রিকেটপ্রেমও বিশ্বে সমাদৃত।

 

বাংলাদেশ দল অন্যান্য দলগুলোর মতোই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সমান সফলতার জন্য লড়াই করে অর্থাৎ ১৩০ কোটি জনসংখ্যার ভারত যেমন ১৫ জনের দল নিয়ে ম্যাচ জিততে চায় ও বিশ্বকাপ জিততে চায়, তেমনি ১৮ কোটির বাংলাদেশও ১৫ জনের দল নিয়ে জিততে চায় ও বিশ্বকাপ জিততে চায়। কিন্তু দুই দলের ক্রিকেট কাঠামোর তফাৎ আকাশ পাতাল। শুধু ভারত কেনো, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, আফ্রিকা, এমনকি শ্রীলংকা-পাকিস্তানের মানের চেয়েও নিচে বাংলাদেশ। অথচ ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম ধনি বোর্ড বিসিবি। কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে গতানুগতিক ধারার বাহিরে কোন ভিন্ন ভাবনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ক্রিকেটে ক্যারিয়ার গড়তে চাওয়া হাজার হাজার তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ নেই।

 

ভারতের রঞ্জি ট্রফি (প্রথম শ্রেণী) খেলে প্রায় ৪০টি দল। একই ভাবে সৈয়দ মুস্তাক আলী ট্রফিও (টি২০) খেলে ৪০টির মতো দল। বিজয় হাজরা ট্রফি খেলে (ওয়ানডে) ২৮টি দল। আইপিএল আয়োজন হচ্ছে ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছর। এছাড়াও রাজ্য ক্রীড়া সংস্থার অধীনে ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক টি২০ লীগ আয়োজন হয় বেশ কয়েকটি। যেখানে জাতীয় ক্রিকেটাররাও অংশগ্রহণ করেন এবং সেসব টুর্নামেন্টের কোচিং স্টাফ বিশ্বমানের। আন্তর্জাতিক মানের সম্প্রচারের কারনে সেসব টুর্নামেন্টও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।

 

বিভিন্ন লীগের বাহিরে অনুর্ধ্ব ১৯ দল, অনুর্ধ্ব ২৩ দল, ইন্ডিয়া এ, বি, ইন্ডিয়া রেড, গ্রীণ সহ বিভিন্ন নামে আরো একাধিক দল গঠন করা হয় এবং নিয়মিত খেলার আয়োজন হয় দেশ বিদেশে। সবমিলিয়েই জাতীয় দল গঠন করা হয়।

 

ভারতের বিশাল মানব সম্পদ থাকার পাশাপাশি ক্রিকেটকে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি দেওয়ার কারনেই এতো দল এবং টুর্নামেন্ট আয়োজন সম্ভব হচ্ছে। ভারত এতো এতো দল ও টুর্নামেন্ট মিলিয়ে সেই ১৫ জন ক্রিকেটারকেই বাছাই করে। বিপরীতে বাংলাদেশ দল ৮ দলের জাতীয় লীগ, ৪ দলের বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগ, ১২ দলের ঢাকা লীগ ও ৭/৮ দলের বিপিএলই আয়োজন হয় শুধু। এছাড়া অনুর্ধ্ব ১৯ দল থাকলেও নেই নিয়মিত বাংলাদেশ এ দল।

 

বাংলাদেশের মানুষ ক্রীড়াপ্রেমী। আর এই ক্রীড়াপ্রেমের প্রায় পুরোটা জুড়েই কেবল ক্রিকেট। ক্রিকেটার হতে চায় দেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের পৃষ্ঠপোষকও ব্যাপক। বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যাশার চেয়েও বেশি এগিয়ে আসছে ক্রিকেটের প্রয়োজনে। দর্শক উম্মাদনা, মিডিয়া কাভারেজ সবমিলিয়ে ক্রিকেট বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে গভীর ভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

 

বাংলাদেশ জাতীয় লীগের ৮টি দলে ১২০ জন ক্রিকেটার খেলার সুযোগ পায় প্রতি বছর। বিসিএলের ৪টি দলে খেলে ৬০ জন ক্রিকেটার। ঢাকা লীগের ১২টি দলে খেলে ১৮০ জনের মতো ক্রিকেটার। বিপিএলের ৭ দলে ৮০/৯০ জনের মতো বাংলাদেশী ক্রিকেটারের সুযোগ হয়। তার মধ্যে তিনটি লীগেই খেলার সুযোগ হয়, এমন ক্রিকেটার হাতগুণা। ঢাকা লীগে খেলা সকল ক্রিকেটারেরও জাতীয় লীগে খেলার সুযোগ হয় না। ঢাকা লীগ খেলে কিন্তু জাতীয় লীগ কিংবা বিপিএলে খেলার সুযোগ হয় না, এমন ক্রিকেটারের সংখ্যাই বেশি। যারা চাতক পাখির দৃষ্টি নিয়ে বসে থাকে, কখন ঢাকা লীগ আসবে। এর মধ্যে আবার অনেক ক্রিকেটার থাকে, যারা ঢাকা লীগেও জায়গা করে নিতে ব্যর্থ পারফরম্যান্সের হেরফের হলে অর্থাৎ দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন দেখা সকল ক্রিকেটারের সামনে পর্যাপ্ত সুযোগ নেই নিজেদের প্রমাণ করার। ফলে জাতীয় দলের মতো লীগগুলোতেও এক প্রকার চাপে খেলতে হয় ক্রিকেটারদের। ভালো করলে খেলবা পরবর্তী মৌসুমেও, না হয় এখানেই সমাপ্ত। বহু ক্রিকেটারের বেলাতেই এমন ঘটছে, যারা পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না লীগেও।

 

বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেট বিমুখ নয় বরং ক্রিকেটপ্রেমী, যা বিশ্বে সমাদৃত। সেই সাথে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখে লাখ লাখ তরুণ কিন্তু নেই পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা। অন্যান্য দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের দলের তুলনায় জাতীয় লীগ, বিসিএল, ঢাকা লীগে দল সংখ্যা কম হওয়ার পাশাপাশি জেলা ভিত্তিক ক্রিকেটেরও দূরবস্থা। বিভাগীয় শহরগুলোর বাহিরে নিয়মিত প্রিমিয়ার লীগ ও প্রথম বিভাগ আয়োজন করা হয় না, ফলে গ্রামগঞ্জ থেকে ক্রিকেটার উঠে আসার সুযোগ তেমন নেই বললেই চলে।

 

ক্রিকেট শুধুমাত্র একটি খেলাই নয়, এটি রুটি রুজির অন্যতম মাধ্যমও হয়ে উঠছে সারা বিশ্বে। ক্রিকেট খেলে ক্রিকেটাররা আয় করছে, দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হচ্ছে। বিদেশী লীগ খেলে উপার্জন করার মাধ্যমে প্রবাসীদের মতোই দেশের অর্থনীতিতে ভ‚মিকা রাখছে বহু ক্রিকেটার। যেহেতু এখন ক্রিকেট খেলুড়ে প্রায় সব দেশেই টুর্নামেন্ট আয়োজন হয় এবং সেখানে বিদেশী ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ থাকে, ফলে ক্রিকেটার তৈরী করা এবং তাদেরকে খেলায় রাখার মাধ্যমে জাতীয় দল কিংবা ভিনদেশী লীগে খেলার মতো দক্ষ করে তোলার চেষ্টার কোন বিকল্প নেই।

 

বেকারত্ব দূরীকরণেও ভ‚মিকা রাখতে পারে ক্রিকেট। কেননা ক্রিকেটার তৈরী করতে পারলে দেশে বিদেশে খেলার হবেই। ক্রিকেট দিয়ে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করার সুযোগ তৈরী হয়েছে সারা বিশ্বেই। উইন্ডিজ, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, এমনকি হালের আলোচিত দল আফগানিস্তানের ক্রিকেটাররাও ভিনদেশী লীগে পারফর্ম করার মাধ্যমে নিজেদের ক্রিকেট ও অর্থনীতিতে বিশাল ভ‚মিকা রাখছে। কিন্তু পিছিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের ভিনদেশী লীগে চাহিদা কম, হাতগুণা কয়েকজন ক্রিকেটার খেলার সুযোগ পান মাত্র। অন্যান্য দেশ থেকে যেখানে জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পাওয়ার আগেই ভিনদেশী লীগে খেলার সুযোগ করে নেন, সেখানে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটারতো দূরের কথা, জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের অধিকাংশেরই জায়গা হয় না ভিনদেশী লীগে। কেউ কেউ বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করেই নেওয়া হয় না বললেও আদতে তা নয়, টি২০ মানের ক্রিকেটার না থাকার ফলেই আগ্রহটা কম লীগের দলগুলোর।

 

ক্রিকেট নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ যেমন ব্যাপক, তেমনি বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্পন্সর করা সহ দল কেনাতেও এগিয়ে আসে। তাই দেশের ক্রিকেটকে আরো এগিয়ে নিতে, জাতীয় দলের পাইপলাইন শক্তিশালী করা সহ দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করতেও ক্রিকেটকে আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই। এর জন্য জাতীয় লীগে ৮ দলের বিপরীতে ১০ থেকে ১২ দলে উন্নীত করা, ঢাকা লীগে ১২ দলের পরিবর্তে ১৬ থেকে ২০ দলে উন্নীত করা, বিসিএলে ৪ দলের পরিবর্তে ৬ থেকে ৮ দলে উন্নীত করা এবং ঢাকা লীগের দলগুলোকে নিয়ে আলাদা টি২০ লীগের আয়োজন করতে হবে, যার মাধ্যমে আরো বহু নতুন ক্রিকেটারের সুযোগ হবে স্বীকৃত ক্রিকেটে এবং জাতীয় লীগ, ঢাকা লীগ (ওয়ানডে ও টি২০) বিসিএল, বিপিএল মিলিয়ে বছর জুড়েই ঘরোয়া ক্রিকেট চলমান থাকলে ক্রিকেটাররা নিজেদের প্রমাণের পর্যাপ্ত সুযোগ পাবে।

 

এসব লীগে যারা ভালো করবে, তাদেরকে এইচপি দল, বাংলাদেশ এ দল সহ বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে খেলায় রাখার মাধ্যমে জাতীয় দলের পাইপ লাইনকে শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। নিজেদের প্রমাণ করতে পারলে সুযোগ আসবে ভিনদেশী লীগেও। অর্থনৈতিক ভাবেও চিন্তা দূর হবে ক্রিকেটারদের। সবমিলিয়ে লাভবান হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট ও বাংলাদেশই। এই বিষয়ে বিসিবি ও সংশ্লিষ্ট সকলের ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসা জরুরী।