সৌম্যের ব্যাটিং অর্ডার পরিবর্তন: ভুল করছে ম্যানেজমেন্ট!

প্রকাশিত: ৬:৪৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৪, ২০২১

সৌম্যের ব্যাটিং অর্ডার পরিবর্তন: ভুল করছে ম্যানেজমেন্ট!

২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের ভাবনায় ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিচিত মুখ সৌম্য সরকারের ওয়ানডে অভিষেক হয় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। অভিষেক ওয়ানডেতে বাংলাদেশের জয়ের ম্যাচে ১৮ বলে ২০ রানের ইনিংস দিয়ে শুরু। এক ম্যাচের অভিজ্ঞতা দিয়েই ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় সৌম্য সরকার। বিশ্বকাপে একে একে খেলেছেন ২৮, ২৫, ৪০, ৫১ ও ২৯ রানের ইনিংস। বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে ছোট ছোট ইনিংসেও নিজেদের জাত চিনিয়েছিলেন দারুণ ভাবে।

 

২০১৫ সালে ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার ম্যাচে ব্যাট হাতে তান্ডব চালিয়ে খেলেন ১২৭ রানের ইনিংস। ভারতকে হারানোর সিরিজে খেলেন ৫৪, ৩৪ ও ৪০ রানের ইনিংস। আফ্রিকাকে হারানোর সিরিজে খেলেন ২৭, ৮৮ ও ৯০ রানের ইনিংস। আর এতেই ইতিহাস। অন্যান্য ব্যাটসম্যানদের পাশাপাশি সৌম্যের দাপটীয় ব্যাটিংয়ে বিশ্বের তিন অন্যতম শক্তিশালী দলকে হারিয়ে সিরিজ জিতে বাংলাদেশ। সমর্থকদের মাঝে একই সুরে উচ্চারিত হয় “এই মুহুর্তে দরকার, সৌম্য সরকার”।

 

সৌম্যের ব্যাটে নতুন যুগের সূচনা হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটে। প্রতিপক্ষকে গুড়িয়ে দেওয়ার নতুন অস্ত্র পায় বাংলাদেশ। আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের ৩য় ম্যাচে ৯০ রানের ইনিংস খেলার পর ৭ ম্যাচে রান পাননি সৌম্য, যেখানে সর্বোচ্চ ছিলো এক ম্যাচে ৩৮ রান। ৭ ম্যাচ বিরতি দিয়েই নিউজিল্যান্ডের সাথে তাদের মাটিতে খেলেন ৬১ ও ৮৭ রানের ইনিংস। ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন ট্রফির প্রথম ম্যাচে ২৮ রানের ইনিংস খেলার পর ৫ ম্যাচে রান না পেলেও তারপর ম্যাচে ৩৩ ও পরের ম্যাচেই জিম্বাবুয়ের সাথে খেলেন ১১৭ রানের ইনিংস। তার পরের ১০ ইনিংসের মধ্যে খেলেন ১৯, ৮০, ৩০, ২২, ৭৩, ৫৪, ৬৬, ৪২ রানের ইনিংস। তারপর খেলা সর্বশেষ ব্যাট করা ১০ ইনিংসের মধ্যে খেলেন ২৫, ২৯, ৩৩, ২২, ৬৯ রানের ইনিংস। সর্বশেষ দুই ম্যাচে তথা চলতি সিরিজে ব্যাট হাতে নেওয়ার সুযোগ হয়নি।

 

সবমিলিয়ে ৫৭ ওয়ানডেতে দুই সেঞ্চুরীর পাশাপাশি এগার ফিফটিতে করেছেন ১৭২৮ রান।  এভারেজ ৩৩.৮৮। স্ট্রাইকরেট ৯৮.১৭, যা বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ। ক্যারিয়ারের প্রথম ৫৭ ম্যাচে সৌম্যের চেয়ে বেশি রান করতে পারেননি আর কোন বাংলাদেশী ব্যাটসম্যান। বল হাতে ৯ উইকেট শিকার করলেও দলের প্রয়োজনে মিডিয়াম পেসার হিসেবেও দারুণ সার্ভিস দিতে পারেন।

 

২০১৮ সালে লিষ্ট এ ক্রিকেটে প্রথম ও একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে ২০৮ রানের ইনিংসটি সৌম্যই খেলেছেন।

 

২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১৫ টেস্ট খেলে নিউজিল্যান্ডের মতো কঠিন কন্ডিশনে ক্যারিয়ার সেরা ১৪৯ রানে ১ সেঞ্চুরী ও ৪ ফিফটিতে ২৯.১৯ এভারেজ করেছেন ৮১৮ রান। ৫০টি টি২০ ম্যাচে ৬২ রান বেস্টে ২ ফিফটিতে ৮৮৫ রান করেছেন। স্ট্রাইকরেট ১২৫.৩৫ দূর্দান্ত হলেও এভারেজ মাত্র ১৮.৮২। টি২০ ক্রিকেটে নিজের মান অনুযায়ী খেলতে না পারায় সৌম্যকে ব্যর্থ বলা হলে, এই দোষে দুষ্ট বাংলাদেশের সব ব্যাটসম্যানই। কেননা টি২০ ক্রিকেটে বাংলাদেশের কোন ব্যাটসম্যানই বিশ্বমানের ব্যাটিং করতে পারেনি। সেই জায়গা থেকে হার্ডহিটার সৌম্য ঝড়ো ব্যাট করেন বিধায় বর্তমান সময়ে দেশের সেরা ৫/৬ টি২০ ব্যাটসম্যানদের একজন হিসেবেই বিবেচিত হবেন।

 

সৌম্যের ক্যারিয়ার পর্যালোচনায় এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ওয়ানডে ক্রিকেটে সেরাদের মধ্যে অন্যতম সৌম্য। ম্যাচের তুলনায় রান, এভারেজ, স্ট্রাইকরেট মিলিয়ে দেশের সেরা ব্যাটসম্যানের মতোই ওয়ানডে ক্রিকেটে সৌম্যের পারফরম্যান্স। সৌম্য টেস্ট না খেললেও সমস্যা ছিলো না, তারপরও ২৯.২১ এভারেজ বাংলাদেশী ব্যাটসম্যান হিসেবে মন্দ নয়। বিশেষ করে দেশের বাহিরের পেস উইকেটে সৌম্যের ব্যাটিং অসাধারণ। সৌম্য ন্যাচারাল হিটার বিধায় টি২০ ক্রিকেটে সৌম্য অটো চয়েজও হতে পারে।

 

সৌম্য ওয়ানডে ক্রিকেটে শুরু থেকে এতোই ভালো ক্রিকেট খেলেছেন যে, কয়েক ম্যাচে রান না পেলে কিংবা শুরুর মতো খেলতে না পারায় সৌম্যকে ব্যর্থ আখ্যায়িত করে তার সমালোচনায় মেতে উঠেন অনেকে। সৌম্যের বেলায় অনেকেই একটা মুখস্ত বুলি আওড়ান যে, অনেক সুযোগ পেয়েছে সে। বিসিবি তাকে অনেক সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু সে ব্যর্থ। অথচ বাস্তবতা হলো সৌম্য ব্যর্থ নয়। যে সময়টার কারনে সৌম্যকে ব্যর্থ বলে ফেলেন অনেকে, সে সময় হিসেবে সৌম্য অধারাবাহিক হতে পারে বড়জোর। কখনোই ব্যর্থ নয়। কেননা একজন ব্যর্থ ক্রিকেটারের ৫৭ ওয়ানডে ক্যারিয়ারে কখনোই ১৭২৮ রান, ৩৩.৮৮ এভারেজ ও ৯৮.১৭ স্ট্রাইকরেট হতে পারে না। ক্রিকেট দুনিয়ায় এমন নজির আর একটিও নেই যে, একজন ক্রিকেটার ব্যর্থ কিন্তু তিনি ৫৭ ওয়ানডে ম্যাচে ৩৩.৮৮ এভারেজে ৯৮.১৭ স্ট্রাইকরেটে ১৭২৮ রান করেছেন। মূলত সৌম্য শুরুর মতো বিশ্বসেরা ব্যাটিং অব্যাহত রাখতে পারেননি বলেই তার বিরুদ্ধে কয়েক বছর ধরে মিথ্যে অভিযোগ আনা হচ্ছে সমর্থকদের জায়গা থেকে। ২০১৯ সালেও সৌম্য টানা ৬৩, ৫৪, ৬৬, ৪২ রানের ইনিংস খেলেছেন। এর আগে ২০১৮ সালে খেলা ৬ ওয়ানডের মধ্যেও আছে ৮০, ১১৭, ৩৩ রানের ইনিংস। ২০১৭ সালে খেলা ১২ ওয়ানডের মধ্যেও আছে ৬১, ৮৭, ২৮, ৩৮ রানের ইনিংস। ২০১৬ সালে টি২০ ক্রিকেটে বেশি খেলেছে বাংলাদেশ। সে বছর সৌম্য মাত্র ৪টি ওয়ানডে খেলেন এবং চার ইনিংসের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল মাত্র ২০। আর ২০১৫ সাল ছিলো সৌম্যময়।

 

এবার আসি বর্তমান প্রেক্ষাপটে-

২০১৯ সালে শ্রীলংকা সফরের লাষ্ট ওয়ানডেতে সৌম্য খেলেন ৬৯ রানের ইনিংস। লাষ্ট বঙ্গবন্ধু কাপেও চট্টগ্রামের হয়ে দূর্দান্ত ক্রিকেট খেলেন। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচে তিন নাম্বারে নেমে ৮৬ বলে ৬৯ রানের ইনিংস খেলার পর পরবর্তী ওয়ানডে সিরিজ যখনই হোক না কেনো প্রত্যাশিত ভাবেই তার ব্যাটিং করার কথা ছিলো তিন নাম্বারে। কিন্তু করোনার কারনে দীর্ঘদিনের বিরতি পরায় সৌম্যের শেষ আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচে ভালো খেলা মনে রাখেনি বিসিবি। ফলে চলমান ওয়ানডে সিরিজে সৌম্যে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে ৭ নাম্বারে। সৌম্যের ৩ নাম্বারে নামানো হচ্ছে নাজমুল হোসাইন শান্তকে। কিন্তু শান্ত ব্যর্থ।

 

বাংলাদেশ দলে এখন পারফর্মারের ছড়াছড়ি। বেকাপ ক্রিকেটার বাড়ছে, তা অবশ্যই ইতিবাচক বিষয় বাংলাদেশ দলের জন্য। কিন্তু একজন ক্রিকেটারকে তিন ফরম্যাটেই বিবেচনা করা কিংবা বেকাপ ক্রিকেটার আসছে বলেই নিয়মিত খেলা একজনকে তার জায়গা থেকে সরিয়ে ফেলা কাম্য নয় ও ছিলো না। শান্ত প্রতিশ্রুতিশীল ব্যাটসম্যান। সর্বশেষ টি২০ কাপেও সে ভালো করেছে। শতক হাঁকিয়েছে। ভালো খেলেছে সৌম্যও। কিন্তু পরীক্ষিত সৌম্যকে নিচে নামিয়ে দেওয়ার যে যুক্তি তা সাময়িক সময়ের জন্য মেনে নেওয়া গেলেও তা ঠিক হয়নি ম্যানেজমেন্টের। কেননা শান্ত ভালো করছে, তার জন্য তাকে টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত করানো যায়, ওয়ানডেতে নয়। কেননা বাস্তবতা হলো বর্তমান ওয়ানডে দলে শান্তর প্রয়োজন নেই, জায়গাও ছিলো না তার। সৌম্য যেখানে পরীক্ষিত তিনে এবং সাকিব যেখানে তিন নাম্বারে বিশ্বকাপে ভালো করেছে অনেক, সেখানে সৌম্য-সাকিবকে হটিয়ে শান্তকে তিনে নামানোর সিদ্ধান্ত শতভাগ ভুল। কেননা ওয়ানডে ক্রিকেটে শান্তর প্রয়োজনই নেই এখন। তার জায়গা আপাতত বড়জোর তিন ওয়ানডে ম্যাচে কিংবা সৌম্য-লিটন এর মধ্যে কেউ ব্যর্থ হলে, তখন সুযোগ পাবে শান্ত। এর আগে নয়।

 

সৌম্য ন্যাচারাল হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান। সে পরীক্ষিত ও দক্ষ। খুনে মেজাজের ব্যাটিংয়েই সে অভ্যস্থ। সে ওপেনিং ও তিন নাম্বারে নিজেকে অসংখ্যবার প্রমাণ করেছে। তার জায়গা টপ অর্ডার, সাতে নয়।

 

ম্যানেজমেন্ট ও কোচের যুক্তিতে ধরে নিলাম, তিনে শান্ত সফল হলো, তাহলে কি সাকিব-সৌম্য তিন নাম্বারে আর সুযোগ পাবে না? কেনো এমন হবে, প্রয়োজন ছিলো কি কোন? বাংলাদেশের ওয়ানডে দলটি এমনিতেই যথেষ্ট শক্তিশালী এখন। শান্ত যেহেতু ভালো করছে ঘরোয়া ক্রিকেটে, তাকে টেস্টে নিয়মিত করা যায়। কেননা টেস্টে শান্তর জায়গা আছে, ওয়ানডে কোথায়? আর শান্তকে জায়গা করে দিলেও সৌম্যকে কেনো অভজ্ঞা করা হচ্ছে। শান্তকে খেলাতে যদি হয়ই তাহলে শান্তকে ৬-৭ এ খেলতে হবে ওয়ানডেতে, টপ অর্ডারে নয়। কেননা তিনে সাকিব-শান্ত দূর্দান্ত ছিলো।

 

সৌম্যকে ৭ নাম্বারে খেলানোর জন্য রাখার সমালোচনা হচ্ছে ব্যাপক। সমর্থকরা সহ সাবেক ক্রিকেটার ও ক্রীড়া বোদ্ধারা মনে করছেন এটি ম্যানেজমেন্টের ভুল সিদ্ধান্ত। সৌম্যকে টপ অর্ডারে না খেলানোর কোন যুক্তি নেই। আর না খেলালে তাকে একাদশের বাহিরে রাখা যায়, ৭ এ নয় কখনোই। একজন পরীক্ষিত পারফর্মারকে নিয়ে এমন করার মতো বড় দল এখনো হয়নি বাংলাদেশ। বরং এতে হিতে বিপরীত হতে পারে চরম ভাবে।

 

সৌম্যকে যেমন টেস্টে নিয়মিত না নেওয়াই ভালো সিদ্ধান্ত। তেমনি শান্তকে টেস্টে নিয়ে ওয়ানডে-টি২০ ফরম্যাটে না খেলানোই ভালো সিদ্ধান্ত হবে। শান্ত ওয়ানডেতে খেলবে, সেটা টেস্টে অভাবনীয় সফলতা অর্জনের পর এবং লিটন-সৌম্যের কোন একজন ব্যর্থ হওয়ার পর, তার আগে নয়। ক্রিকেটার তোলার মানে এই নয় যে, একজন ক্রিকেটারকে সব ফরম্যাটে নিতে হবে। বরং ক্রিকেটার তৈরীর মানে হলো বেকাপ রাখা এবং ফরম্যাট ভিত্তিক সুযোগ দিয়ে বিশেষজ্ঞ দল তৈরী করা, যা অন্যান্য দলগুলো করছে এবং প্রত্যেক ফরম্যাটে বিশেষজ্ঞ দল তৈরী করে সফলতা পাচ্ছে ব্যাপক।

 

প্রত্যাশা থাকবে সৌম্যের সামর্থ্য ও প্রয়োজনীয়তাটা অন্তত ওয়ানডে ক্রিকেটে বুঝবে ম্যানেজমেন্ট এবং সৌম্যকে তার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। চলমান সিরিজে উইন্ডিজ দ্বিতীয় সারির দল পাঠানোর কারনে যদি ম্যানেজমেন্ট শান্তকে বাজিয়ে দেখতে চাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা যেনো এই সিরিজেই শেষ হয় এবং তৃতীয় ম্যাচে যদি শান্ত ভালোও করে, তবুও যেনো তাকে ওয়ানডেতে টপ অর্ডারে না রেখে সৌম্য-সাকিবেই আস্থা রাখা হয় এবং শান্তকে টেস্ট দলে নিয়মিত করানো হয়।

 

মনে রাখতে হবে সৌম্য বড় ম্যাচের প্লেয়ার। তার সামর্থ আছে বিশ্বের যেকোন জায়গায় যেকোন প্রতিপক্ষকে গুড়িয়ে দেওয়ার মতো ব্যাটিং করার। সে তেমন কাজ বহুবার করেছে। তাই পরীক্ষিত সৌম্যকে নিয়ে যেকোন প্রকার জুয়া খেলা বন্ধ করে তার জায়গায় তাকে খেলতে দেওয়াটােই হবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য মঙ্গলজনক। ম্যানেজমেন্ট আশা করি বুঝে শুনেই ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেবে।

জুবায়ের আহমেদ

কলামিস্ট ও ক্রীড়া লেখক

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget
error: Content is protected !!