যোগের পূর্ণতায় সালাতের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা

প্রকাশিত: ৮:৪৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৯, ২০২১

যোগের পূর্ণতায় সালাতের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা

আতিক উল্লাহ আল মাসউদ:

 

মানব জনজীবনের প্রাথমিক ইলম যোগের সাদৃশ্য। মুসলিম রীতিনীতির প্রধান কার্যপ্রণালী সালাতের সাথে সম্পৃক্ত। মানব ও মুসলিম ইন্দ্রিয়শক্তি ও গঠনের দিক থেকে এক ও অভিন্ন। তদ্রুপ যোগ ও সালাত প্রাথমিক জ্ঞানের মাধ্যমে একটি সেতুবন্ধন।  একজন সুস্থ মস্তিষ্কবান লোক তার জীবনের সাথে যোগের মৈত্রিত্বতা বজায় রাখে । কারণ জীবনের প্রতিটি কার্যক্রম কিছুনা কিছু যোগের আওতায় স্থলাভিষিক্ত হয়ে যায়। তদ্রুপ মুসলিম জনজীবন সালাতের সাথে সম্পৃক্ততা থেকে যায়। আমরা যদি যোগের প্রাইমারি কন্সেপ্ট নিয়ে চিন্তা করি দেখতে পাবো যোগ করতে হলে প্রথমে সংখ্যার জ্ঞান লাভ করতে হয়। সংখ্যার জ্ঞানের সাথে সালাতের মিল হলো, দুটি শর্তে ১,কেরাত ২,রাকাত সংবলিত ইলম। কেরাত বিহীন কোনো নামাজ কবুল হয়না। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, কোরআনের যেখান থেকে সহজ তোমরা সেখান থেকে নামাজে তেলাওয়াত কর। (সুরা মুযযাম্মিল)

 

 

যোগের ক্ষেত্রে সংখ্যা না জানলে যোগ করা সম্ভব হয়না, তদ্রূপ সালাতের ক্ষেত্রে কেরাত না জানলে নামাজ হয়না। আমরা যোগ করার জন্য সংখ্যা “একশ” পর্যন্ত আয়ত্ত করে নি। অপরদিকে কেরাত আয়ত্ত করার ক্ষেত্রে সুরা ফাতিহা আয়ত্ত করে নিতে হয়। রাসুল (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি নামাযে সুরা ফাতিহা পাঠ করেনি তার নামাজ পূর্ণ হয়নি। (বুখারী,মুসলিম)

সংখ্যা ও কেরাত জানার পর আমরা যোগ করার সময় সিরিয়াল তথা সারি মাফিক সংখ্যা বসাতে হয়। সাধারণত নিয়ম হলো বাম দিক থেকে স্থান নির্ণয় করা। সারি নির্ধারণ ও যথার্থ প্রসেসের সাথে সালাতের মিল হলো, রুকু, সেজদা ও তাসবীর নিয়মমাফিকতা। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা রুকু কারীদের সাথে রুকু কর (সুরা বাকারা ৪৩) তার মানে হলো, যোগের সংখ্যা বসানোর ক্ষেত্রে যেমন করে শিক্ষক বাম দিক হতে উপরের সংখ্যা বরাবর নিচের সংখ্যা বসানোর কথা বলে তদ্রূপ,সালাতের ক্ষেত্রে আল্লাহ  বলেন, ইমাম যেভাবে রুকু, সেজদা করবে তোমরাও তার অনুসরণ করে তাই কর। যোগ নির্ণয়ে যেমন করে সারি নির্ধারণ অথবা নিয়মমাফিক করতে হয় তদ্রুপ সালতেও নিয়ম অনুসারে আদায় করতে হয়, না হয় দুই ক্ষেত্রেই অপূর্ণতা দেখা দিবে। যোগের পদ্ধতিতে সংখ্যা বসানোর পর যোগের প্রতিক (+) চিহ্ন বসানো লাগে। যোগের প্রতীক বসানোর সাথে সালাতের সম্পৃক্ততা হলো, পরিচ্ছদের ধরণ পদ্ধতি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে বনি আদম, প্রত্যেক নামাজের সময় সুন্দ্র পোষাক পরিধান কর [সুরা আরাফ-৩১]। যোগ করার সময় যেরুপ প্রতীক ব্যবহার প্রয়োজন তদ্রুপ সালাতেও প্রতীকি হিসেবে পরিচ্ছেদের বিষয় সতর্ক থাকা প্রয়োজন। রাসুল (সাঃ) বলেন, হাফ শার্ট পরিধান করে নামাজ পড়া মাকরুহ। যোগের প্রতীক ও সালতের প্রতীক পরিচ্ছদ দুইটাই অপরিহার্য। যোগের নির্ণয়ে দুটি সংখ্যা সারিবদ্ধ বসানোর পর একটি রেখা টানতে হয়। যোগের রেখার সাথে সালাতের সম্পৃক্ততা হলো, আরকান বিষয়ক। যোগের তারতম্যতায় রেখাটি সৌন্দর্য বর্ধন করে। সালাতেও ধীরস্থীরতা সৌন্দর্য সৃষ্টিতে ভুমিকা রাখে। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, তোমরা সেজদা অবস্থায় তাদীল অবলম্বন কর [বুখারী, মুসলিম]।যোগের রেখা ও সালাতের তাদীল দুটিই সৌন্দর্য বর্ধন করে। যোগের ধারনায় রেখায় পর পূর্ণ মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন, না হয় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 

যোগের এই শাখার সাথে সালাতের সম্পৃক্ততা হলো, পূর্ণ মনোযোগ সাধন করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা ইবাদত একনিষ্ঠতার সাথে কর।[সুরা বাইয়্যেনা-৫] । পূর্ণ মনোনিবেশ করে সালাত আদায় করতে হয়। রাসুল (সাঃ) বলেন, তোমরা এমন ভাবে ইবাদত (সালাত) আদায় কর যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছো। [বুখারী, মুসলিম] । তিনি আরো বলেন, তোমরা বিদায়ী নামাজ পড়। সালতে পূর্ণাঙ্গ মনোনিবেশ না হলে কবুল নাও হতে পারে। তাহলে বুঝা যায়, যোগের মনোনিবেশ যেমন করে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তদ্রূপ সালাতেও ভুলের সম্ভাবনা দৃশ্যমান।  যোগের যে শাখাটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো উপরে নিচে সংখ্যা গণনা ও শুদ্ধতা নিশ্চিত করা। যোগের এই অতীব প্রয়োজনীয় শাখার সাথে সালাতের মেলবন্ধন হলো, আরকান ও আহকাম সংবলিত ১৩ টি ফরজ কার্যক্রম। যোগে সংখ্যা গণনার ক্ষেত্রে সংযোজন – বিয়োজন হয়ে গেলে, সম্পূর্ণ অংকটি ভুল হয়ে যায়। ঠিক সালাতেও আরকান ও আহকাম সংবলিত ১৩ টির যেকোনো একটিতে বিঘ্নতা ঘটলে সালাত বাতিল হয়ে যায়। যেমন ফাতওয়া শামি ও হিদায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে, নামাযের কোনো ফরজ বাদ পড়লে নামাজ বাতিল হয়ে যায়। তাহলে বুঝা যায় যোগের এই শাখাটির সাথে সালাতের ফরজ কাজগুলো একটি সাকোঁর মতো।

 

যোগের যে শাখাটি খুবই আশ্চার্যজনক হাতে থাকা সংখ্যাটি । এই শাখার সাথে সালাতের সফলতার মিল রয়েছে। যোগের নিয়মে দশ সংখ্যা থেকে উর্ধ্বে সকল সংখ্যায় একের অধিক হওয়াতে ডানের সংখ্যাগুলো প্রথমে হাতে রেখে দ্বিতীয় সংখ্যার সাথে  যোগ করতে হয় , যার ফলে সম্পূর্ণ যোগটি শুদ্ধ ও সম্পূর্ণ হতে ভূমিকা রাখে। তদ্রুপ সালতের মাধ্যমে সফলতা নিশ্চিতে গুনাহসমূহ ক্ষমার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ সফলতা লাভ করা যায়। রাসুল (সাঃ) বলেন, মুসলিম বা মুমিন বান্দা যখন অযু করে তখন অযুর পানির মাধ্যমে চোখের গুনাহ, মুখের গুনাহ ও হাত পায়ের গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয় (মুসলিম)। যোগের সময় হাতে থাকা সংখ্যাটি সময়ের ব্যবধানে আর গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সালতে অযুর মাধ্যমে গুনাহ মাফ হয় কিন্তু এই সংখ্যার মতো ব্যবধানের প্রয়োজন হয়। রাসুল (সাঃ) বলেন, অযুর পর অবশিষ্ট পানিটি ঝরার পূর্বে মাসেহ করো নাহ (মিসকাতুল মাসাবিহ) । যদি মাছেহ করা হয় গুনাহ ঝরার সময় পাওয়া যায় না। যোগের ক্ষেত্রেও হাতে থাকা সংখ্যা মুছে ফেললে সংঘাত হতেও পারে ফলে ভুলের আশংকাও থেকে যায়। যোগের সর্বশেষ শাখা হলো, সমাধান। সালতের সর্বশেষ শাখা হলো চুড়ান্ত সফলতা । রাসুল (সাঃ) বলেন।, যথাযথভাবে যেই ব্যক্তি নামাজ আদায় করবে এই নামাজ কেয়ামতের দিন তাহার জন্য নুর হইবে ( মোসনাদে আহমদ)। হাদিসের এই নূর হলো, জান্নাত ও সাফল্যের নূর। পরিশেষে বলা যায়, যোগ অংকের মাধ্যমে সালাতের সাফল্য ও সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন সম্পর্কে স্থীরজ্ঞান লাভ করতে আমরা  সক্ষম। মূলত জীবজগৎ অথবা যেকোনো বস্তুনিষ্ঠা জ্ঞান থেকে চিন্তা-চেতনার মাধ্যমে আমাদের সফলতার মাধ্যম খুঁজে নিতে সক্ষম হয়। একটি যোগ অংক স্তরে- স্তরে আমাদেরকে গাইডলাইন দিয়ে থাকে, যদি আমরা বুঝতে সক্ষম হতে পারি। আমাদের সকলের উচিত সফলতার মানদন্ডে প্রত্যেক অবস্থান থেকে সক্রিয় হওয়া ও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান লাভ করা। একটি যোগ অংক একজন চিন্তাশীল মানুষকে পূর্ণাঙ্গ সফলতায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে।

 

 

লেখক,

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ,

 

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget
error: Content is protected !!