একাত্তরের নারীদের প্রকৃত পরিচয়

প্রকাশিত: ৬:৪১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৭, ২০২০

একাত্তরের নারীদের প্রকৃত পরিচয়

জুয়েনা আক্তার:

 

রক্তক্ষয়ী এক সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জন্মলাভ করে। ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনীর তাণ্ডবে বাংলার এক এক একটি গ্রাম পরিণত হয়েছিল এক একটি বদ্ধভূমিতে। শ্মশান আর বাসস্থানের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। গণহত্যা,ধর্ষণ,নির্যাতন আর অগ্নিসংযোগে বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়ে সর্বহারা করে দিয়েছিল এদেশের মানুষকে। অসংখ্য মানুষ বাস্তুহারা হয়ে নিজ দেশে যাযাররের ন্যায় ঘুরে বেড়িয়েছে। একাত্তরের নারীদের উপর যে পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছিল তা পৃথিবীর যেকোন নির্যাতনের শীর্ষে। তবে মুক্তিযুদ্ধে নারীদের যে গৌরবগাথাঁ রয়েছে তা কেবল ধর্ষিত,নির্যাতিত নারীর ভূমিকায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবেনা। ভাষণে,বক্তৃতায় কিংবা লেখনীতে বেশি ব্যবহৃত হয় যে,আমরা ৩০লক্ষ শহীদ আর ২লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছি। কেননা যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে নারীদের ধর্ষণের প্রচার প্রকাশই বেশি। কিন্তু বাংলাদেশের বিজয় অর্জনে নারীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে, বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে,অনুপ্রেরণা দিয়ে ভূমিকা রেখেছেন। বিজয় অর্জনে গ্রামীণ সাধারণ নারীদের ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি ধাপেই সৃজনশীল, দক্ষ,বীর যোদ্ধা ও সংগঠক হিসেবে নারীর অবদান তথ্য সমৃদ্ধ।

 

 

 

একাত্তরের নারীদের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরতে হলে সে সময়ের সমাজব্যবস্থা,ধ্যানধারণা,সমাজে নারীর অবস্থান সবকিছু বিবেচনা করতে হবে। তখন একজন সাধারণ নারী বন্দুক হাতে যুদ্ধ করতে চাইলেও ছিল নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। তবে অনেক নারীরা প্রতিবন্ধকতার উর্ধে উঠে দেশমাতৃকার কল্যাণে কাজ করেছেন। অবশ্য শুধু বন্দুক হাতে নিয়ে শত্রুনিধন করলেই যুদ্ধ হয় না, অস্ত্র ছাড়াও যুদ্ধ করেছে অনেক নারী। একাত্তরে যখন একজন নারীর উপর হানাদাররা দলবেঁধে ঝাঁকিয়ে পড়ত,তার সংবেদনশীল অঙ্গগুলো বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে দিত,কোমড়ের মাংস জীবন্ত অবস্থায় কেঁটে নিত তখন যুদ্ধ হয়েছে সে নারীর শরীরের উপর। তাই যুদ্ধে আর বিজয় অর্জনে নারীর অবদানকে অন্য কোনো কিছুর কাছে ম্লান করে দিলে চলবেনা।

 

 

মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী অনেকেই আজ বেঁচে নেই। যারা রয়েছেন তাদের স্মৃতিতে প্রলেপ পড়েছে। তবুও এই প্রজন্মকে একাত্তরের নারীরদের অবস্থা ও প্রকৃত পরিচয় জানানোর জন্য মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রবন্ধটি রচনা করেছি। এ প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে যুদ্ধকালীন নারীদের জীবনব্যবস্থা,শত্রুদের কবল থেকে নিজেদেরকে রক্ষার কৌশল, গর্ভবতী নারীদের করুণ অবস্থা। এছাড়াও এই প্রবন্ধে রয়েছে নৃশংস নারী নির্যাতনের বিচিত্ররূপ এবং যুদ্ধপরবর্তী সমাজে নির্যাতিত নারীদের অবস্থার খণ্ডচিত্র। এমন এক নারীর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে যিনি তার সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হওয়া ভাইয়ের বিকৃত লাশ খুঁজে বেড়িয়েছেন। এই গবেষণামূলক প্রবন্ধটি রচনার মূল উদ্দেশ্য হলো একাত্তরের নারীদের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরা এবং বিজয় অর্জনের এত বছর পর নারীদের অবস্থা তুলনা করা।

 

 

উৎসমূহঃ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রবন্ধটি রচনা করা হয়েছে। এছাড়া প্রাসঙ্গিক তথ্য তুলে ধরার জন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিছু বই, তৎকালীন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ পরোক্ষ উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। উল্লেখিত প্রত্যক্ষদর্শীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া করা হলোঃ

১নম্বর সাক্ষাৎকার দাতা-সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা।

 

 

নামঃ রুবিয়া বেগম

স্বামীর নামঃ সিরাজ উদ্দীন ভূঁইয়া

বয়সঃ ৭০(মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স ২১)

ঠিকানাঃগ্রাম-পলাশতলী,পো-রায়পুরা,জেলা-নরসিংদী।

২নম্বর সাক্ষাৎকার দাতাঃ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার বোন।

নামঃ রমজানি

বয়সঃ ৫৮(মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স ৯বছর)

ঠিকানাঃ গ্রাম-রাজনগর,পো-রায়পুরা, জেলা-নরসিংদী।

৩নম্বর সাক্ষাৎকার দাতাঃ বীরাঙ্গনার ভাই

নামঃ বকুল মিয়া

বয়সঃ ৬১(মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স-১২ বছর)

ঠিকানাঃ গ্রাম-আশারামপুর,পো-রায়পুরা, জেলা -নরসিংদী।

 

মূল প্রবন্ধঃ ১৯৭১সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলার মানুষেরা খাদ্যহীন,বস্ত্রহীন,বাসস্থানহীন হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেছে। চিকিৎসা পাওয়া ছিল দুষ্কর। বাজারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। যুদ্ধকালীন সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী রুবিয়া বেগম বলেন,” হেলবা পেডো ভাত আছে! কেউর বাড়িতে গেলে কেউ হাদজে না। কেউর বাড়িতে একটা প্লেটও পাইছিনা খাইতাম।পাতা ছিঁড়া ভাত খাইছি।” মুক্তিযুদ্ধের সময় রুবিয়া বেগম বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। তিনি লুকিয়ে ভাত নিয়ে যেতেন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। কখনও মুক্তিযোদ্ধারা তার বাড়িতে এসে খেয়ে যেতেন। তিনি বলেন,” উনারা (মুক্তিযোদ্ধারা) যেলবা সুযোগ পাইছে হেরার সুযোগমত আইছে। সন্ধ্যারসম,রাত্রে আইতো আবার বিকালেও আইতো।সকালে আইছে না। “অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধারা যখন সুযোগ পেতেন অন্ধকারে কিংবা নীবর সময়ে আসলে তিনি খাবার দিতেন তাদেরকে। চরম অভাবের এ সময়ে তিনি অধিকাংশ সময় নিজের খাবার না খেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের দিতেন। নারীদের এমন ত্যাগের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। বিস্তর গবেষণার অভাবে জাতির সামনে গ্রামীণ সাধারণ নারীদের অবদান উঠে অাসেনি। তখন নারীদের বন্দুক হাতে যুদ্ধ করার অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। ফলে অনেক নারী পুরুষের পোশাক পরে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। মালেকা বেগম ‘একাত্তরের নারী’ গ্রন্থে এমন নারীর কথা উল্লেখ করেছে যারা পুরুষের বেশে যুদ্ধ করেছেন। সমাজ,রীতিনীতির শৃঙ্খল ভেঙে এমন বীর নারীরা আমাদের বিজয় এনে দিয়েছেন। তাদের অবদান অস্বীকার করা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক নারী বীরত্ব প্রদর্শন করেছে যুদ্ধ করে,অনেকে আবার জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। অনেক নারী বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়। বিশেষত গর্ভবতী নারীরা চরম দুর্ভোগে ছিল। হানাদারদের থেকে নিজেদের সম্ভ্রম রক্ষা করতে তারা বিভিন্ন জায়গায় পলায়ন করতো রাতের আঁধারেও। এমন অনেক গর্ভবতী নারীর ধনুষ্টংকারসহ বিভিন্ন রোগে বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়ার তথ্য রয়েছে।

 

 

অনেক নারীরা মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বজনদের হারিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের একজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধার বোন রমজানি। তার ভাই শহীদ সোহরাব হোসেন ১৯৭১সালের ১৪ই জুলাই বেলাব বড়িবাড়ি টুক যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। হানাদাররা তাকে এতটাই নির্মমভাবে হত্যা করে ছিল যে তার লাশ অনেকটা বিকৃত হয়ে যায়। রমজানি ও তার পরিবারের সদস্যরা পাগলের মতো খুঁজে বেড়িয়েছেন তার ভাইয়ের বিকৃত লাশ। শেষ পর্যন্ত পাক সেনাদের ভয়ে তারা রাতের অাঁধারে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার লাশ সমাহিত করেন। স্বজনহারানোর ব্যাথা আজও ভুলতে পারেননি তারা। ১৯৭১সালে হানাদাররা নারীদের উপর বিচিত্ররূপে নির্যাতন করেছে।কিছু ক্ষেত্রে এতটাই নৃশংস নির্যাতন করেছে যা অবর্ণনীয়।”প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে প্রকাশ মুদাফফরগঞ্জে এই বর্বরতা চরম রূপ নিয়েছিল। এখানে এক বাড়িতে কয়েকজন রাজাকার একটি মেয়েকে ধর্ষণে প্রবৃত্ত হলে বাড়ির লোকজন বাঁধা দেয়। পরেরদিন একদল রাজাকার সে বাড়ি অাক্রমণ করে ৩৭ জন লোককে হত্যা করে এবং বাড়ির কিশোরী যুবতী গৃহবধুসহ ৮জন নারীরকে ধরে নিয়ে ধর্ষণ করে হত্যা করে। ৪দিন পর তাদের মৃতদেহ পাশের একটি খালে ভাসতে দেখা যায়।”[তথ্যসূত্র-আসাদুজ্জামান অাসাদ,একাত্তরের গণহত্যা ও নারী নির্যাতন,আগামী প্রকাশনী,ঢাকা,২০১৯,পৃ.৯১]। ” এরপর বহু যুবতী মেয়েকে হেডকোয়ার্টারের উপরের তলায় বারান্দার মোটা লোহার তারের উপর উপর চুলের সাথে বেঁধে ঝুম রাখা হয়। প্রতিদিন পাঞ্জাবিরা সেখানে যাতায়াত করতো আর সেই ঝুলন্ত উলঙ্গ দেহের কোমড়ের মাংসে বেটন দিয়ে উন্মুক্তভাবে অাঘাত করতে থাকতো,কেউ তাদের বক্ষের স্তন কেটে নিয়ে যেত,কেউ হাসতে হাসতে তাদের যোনীপথে লাঠি ঢুকিয়ে অানন্দ করতো,কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে কোন যুবতীর পাছার মাংস অাস্তে অাস্তে কেটে কেটে অানন্দ করতো………প্রতিদিন এভাবে বিরামহীন প্রহারে মেয়েদের মাংস কেটে রক্ত ঝরছিল,মেয়েদের কারো মুখের সম্মুখের দাঁত ছিলনা,ঠোঁটের দুদিকের মাংস কামড়ে, টেনে ছিড়ে ফেলা হয়েছিল,লাঠি ও রডের অবিরাম পিটুনিতে প্রতিটি মেয়ের অাঙুল,হাতের তালু ভেঙে থেঁতলে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। “[তথ্যসূত্র-বিপ্রদাস বড়ুয়া (সঙ্কলন ও সম্পাদনা),মুক্তিযুদ্ধের নির্যাতনের দলিল, বাংলাপ্রকাশ,ঢাকা,২০১৩,পৃ.৫৬]

 

 

এমন অসংখ্য নৃশংস নির্যাতনের দলিল রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের সামাজিক মর্যাদা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না তৎকালীন সমাজ। ফলে অনেক নির্যাতিত নারী সমাজে স্থান না পেয়ে অাত্মহত্যা করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার অাশারামপুর গ্রামের একই পরিবারের ৩জন নারীকে ধরে নিয়ে যায় পাক সেনারা।মাসব্যাপী ধর্ষণ করে তাদেরকে। কিন্তু যুদ্ধ পরবর্তীতে সমাজ তাদেরকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি। ফলে সাধারণ মানুষদের মতো বেঁচে থাকার আবেদন করে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করে। বীরাঙ্গনার ভাই বকুল মিয়া বলেন,” সমাজে অামার বইনডে দেখতে পারেনা, আমডারেঅ দেখতে পারেনা। তখন অামার বইনে যেকোন পর্যায়ে টেহা পয়সা দিয়া বিয়া শাদি দিছি। জামাইয়ে এলাকার মাইনষে নানান কতা ক। পরে আমার নিজের বইনে নিজে বিষ খাইয়া অাত্মহত্যা কইরা মারা গেছে। ” এমন অনেক নারী সামাজিক মর্যাদা না পেয়ে অাত্মহত্যা করেছে। তাদের আত্মত্যাগ ভুলার মতো নয়।

 

 

 

১৯৭১সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ। সকল মানুষের অংশগ্রহণ ছিল এই যুদ্ধে। সবার অবদানই অমূল্য,বিশেষত নারীদের অবদান। কিন্তু নারীরা আজও সামাজিকভাবে অনিরাপদ। একাত্তরের হানাদারদের কাছে বাংলার মা-বোনেরা যেমন অনিরাপদ ছিল আজ স্বাধীনতার এত বছর পরেও এদেশে নারীরা অনিরাপদ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আজ কোন হানাদার পাক বাহিনী নয় বরং এদেশের কিছু পথভ্রষ্ট পুরুষের কাছে অনিরাপদ নারীরা। প্রত্যেকটি ধর্ষণের কাহিনী ভিন্ন কিন্তু পরিণতি একই। সেই মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতিত নারী কিংবা এখনকার ধর্ষিত নারী প্রত্যেকের পরিণতি একই। উপযুক্ত সামাজিক মর্যাদা তারা পায় না উল্টো তাদেরকে কটু কথা শোনানো হয়। মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে দেশ পেয়েছি সে দেশে নারীদের সম্মান করা,উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়া,ধর্ষণবিরোধী সমাজ গঠন করা আমাদের দায়িত্ব। যেসব শহীদদের রক্তে আজও ভেজা এ মাটি সে মাটিতে কোন নারীকে ধর্ষণ করা তাদের সাথে তামাশা করা বৈ কি! কেননা এসব শহীদরা নিজেদের মা বোনদের ইজ্জত বাঁচাতে শত্রুদের সাথে লড়েছিল। তাই এ বিজয়ের মাসে ধর্ষণমুক্ত সমাজ গঠনে আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া উচিত।

 

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget
error: Content is protected !!