বিজয় উদযাপন

প্রকাশিত: ৯:১০ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৬, ২০২০

বিজয় উদযাপন

কবির কাঞ্চন

আরমাত্র একদিন পরই বিজয় দিবস। চারিদিকে উৎসবের আমেজ। বাঙালির ঘরে ঘরে বিজয়ের আনন্দ শুরু হয়ে গেছে।

রমজান আলী একটি বেসরকারি স্কুলের অফিস সহকারী পদে চাকরি করেন। সেই সকালে ঘর থেকে বের হন। আর স্কুলের সবার চলে যাবার পর সন্ধ্যা করে বাসায় ফিরেন।
এইমাত্র অফিস থেকে বাসায় ফিরেছেন। কাঁধে অফিসের ব্যাগ। তার উপর হাতে ব্যাগ ভর্তি বাজার। দূর থেকে স্নেহা ছোট ছোট পায়ে বাবার কাছে ছুটে আসে।

স্নেহা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। মেধাবী ছাত্রী। নতুন কোন কিছু সামনে দেখলেই বাবাকে কিংবা মাকে প্রশ্ন করে বসবে। এই কচি বয়সে বাবার সততা তাকে মুগ্ধ করেছে। টানাপোড়েনের সংসারে চাহিদা মতো সব না পেলেও স্নেহা মন খারাপ করে না।
বাবাকে কাছে পেলে ওর মতো সুখি যেনো পৃথিবীতে আর কেউ নেই।
বাবার কাছে এসেই বাবাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে পাগলামো শুরু করে।
তখন রমজান আলী কোনমতে কাঁধের ব্যাগটা পাশে রেখে মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এসময় বাবা মেয়ের সারাদিনের জমে থাকা সব কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন।
এটি যেনো তার অনেকটা রুটিন কাজের মতো। অফিস থেকে কখনও মন খারাপ করে ফিরলেও স্নেহার মিষ্টি মুখখানা চোখে পড়তেই জগতের সব কষ্ট তার মন থেকে ক্ষণিকেই উধাও হয়ে যায়।
স্নেহা তার বাবার সব কথা মেনে চলে। বিশেষ করে বাবাকে কাছে পেলে ও যেনো জগতের আর সব ভুলে যায়। সারাক্ষণ বাবার সাথে আঠার মতো লেগে থাকে। রমজান আলীও মেয়ের প্রতি খুব সচেতন থাকবার চেষ্টা করেন।

স্নেহার যখন দেড় দুই বছর বয়স ছিল তখন স্নেহার যত্নের বিষয় নিয়ে মাঝে মধ্যে স্ত্রীর সাথে তার ভুল বোঝাবুঝিও হতো। রমজান আলী মনে করতেন, স্ত্রী মেয়ের প্রতি তেমন যত্নশীল নয়। মেয়েটি যেনো কেবলই তার। অবশ্য জমিলা বেগমও স্বামীকে তার যুক্তি শুনিয়ে দিতেন। তার মতে, সারাদিন তিনিই স্নেহার দেখাশুনা করেন। স্বামীকে কিছু সময়ের জন্য কাছে পেলে মেয়েকে তার কাছে দিয়ে তিনি নির্ভার থাকেন।
রমজান আলী স্ত্রীর এমন বক্তব্যে নির্বাক থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে  হাসতেন। আর ভাবতেন, সত্যি  তো! আমরা সারাদিন কাজে-কামে বাইরে থাকি। ছেলেমেয়েরা আমাদের তেমন কাছে পায় না। যখন বাসায় আসি তখন ওরা তো আমাদের নিয়ে মেতে থাকবে। এটাই স্বাভাবিক।
ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে স্ত্রীকে নাম ধরে ডাক দিলেন।
জমিলা বেগম স্বামীর গলার আওয়াজ পেয়ে দৌড়ে এসে বাজারের ব্যাগটি নিয়ে  মৃদু হাসলেন। রমজান আলীও স্ত্রীর দিকে মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসলেন। এরপর বাজারের ব্যাগটা নিয়ে জমিলা বেগম রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।

রাত আটটা বাজে। রমজান আলী স্ত্রী ও কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে টিভিতে বিজয় দিবসের প্রোগ্রাম দেখছেন। স্নেহা টিভিতে জাতীয় পতাকা দেখতে পেয়ে জোরে জোরে বলতে লাগলো,
– আব্বু,আম্মু দেখো বাংলাদেশের পতাকা। কী সুন্দর!
রমজান আলী মেয়ের দিকে হাস্যোউজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে বললেন,
– হ্যাঁ , মামণি। ওটা আমাদের দেশের জাতীয় পতাকা।
– আচ্ছা আব্বু, জাতীয় পতাকা আমাদের কী কাজে লাগে?
– জাতীয় পতাকা জাতি বা রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক।
–  তাহলে পতাকায় সবুজের মাঝখানে গাঢ় লাল বৃত্ত কেন?
– সবুজ রং বাংলাদেশের সবুজ প্রকৃতি ও তারুণ্যের প্রতীক। আর বৃত্তের লাল রং উদিয়মান সূর্য। স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারীদের রক্তের প্রতীক।

 

পাশ থেকে জমিলা বেগম বলে উঠলেন,
– এই পতাকার পিছনের গল্পটা তাহলে আমিই বলি।
জাতীয় পতাকার এই রূপটি ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি সরকারীভাবে গৃহীত হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্যবহৃত পতাকার উপর ভিত্তি করে এই পতাকা নির্ধারণ করা হয়। তখন মাঝের লাল বৃত্তে বাংলাদেশের মানচিত্র ছিল। পরবর্তীতে পতাকাকে সহজ করতেই মানচিত্রটি বাদ দেয়া হয়।
লাল বৃত্তটি একপাশে একটু চাপানো হয়েছে। পতাকা যখন উড়বে তখন যেনো এটি পতাকার মাঝখানে দেখা যায়।
আদি পতাকাটি এঁকেছিলেন স্বভাব আঁকিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হলের ছাত্রনেতা শিবনারায়ণ দাশ।
এরপর ১৯৭১ সালের ২রা মার্চে আ.স.ম. আব্দুর রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ইতিহাসে প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন।
শিবনারায়ণ দাশের ডিজাইনকৃত পতাকার মাঝে মানচিত্রটি বাদ দিয়ে শিল্পী কামরুল হাসান দ্বারা পরিমার্জিত রূপটিই বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। এখন বুঝতে পেরেছো?
স্নেহা হাসিমাখা কন্ঠে বলল,
– হ্যাঁ মা, তুমি তো দেখছি আমাদের স্যারদের মতো করে বুঝিয়ে দিলে। আমার আর একটা প্রশ্ন আছে।
– কী সম্পর্কে?
– আমাদের পাঠ্যবইয়ে সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের ছবি আছে। কিন্তু তেমন ব্যাখ্যা দেয়া নেই। তাঁদের বীরশ্রেষ্ঠ বলা হয় কেন?
– যুদ্ধক্ষেত্রে  অতুলনীয়  সাহস  ও আত্মত্যাগের নিদর্শন স্থাপনকারী যোদ্ধার স্বীকৃতিস্বরূপ এই  পদক  দেয়া হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে  শহীদ  সাতজন মুক্তিযোদ্ধাকে এই পদক দেয়া হয়েছে । বীরশ্রেষ্ঠ  বীরত্বের জন্য প্রদত্ত  বাংলাদেশের  সর্বোচ্চ  সামরিক পদক।
– আর কি কোন স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল?
– হ্যাঁ, গুরুত্বের ক্রমানুসারে  বীরত্বের  জন্য প্রদত্ত বাংলাদেশের অন্যান্য সামরিক পদক হল – বীর উত্তম, বীর বিক্রম  ও  বীর প্রতীক। ১৯৭১ সালে  মুক্তিযুদ্ধের  পরই এই পদকগুলো দেয়া হয়।
মায়ের কাছ থেকে প্রত্যাশিত উত্তর পেয়ে স্নেহার চোখেমুখে আনন্দের ছাপ স্পষ্ট।
এরিমধ্যে টিভিতে সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের ছবি দেখতে পেয়ে হাতের ইশারা করে স্নেহা বললো,
– আব্বু, দেখো সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের ছবি।
রমজান আলী আবেগী গলায় বললেন,
– উনারা আমাদের দেশের সূর্যসন্তান। আমাদের অহংকার। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ। দেশের স্বাধীনতার জন্য উনারা নিজের মূল্যবান জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।
– তাহলে তো উনারা আমাদের আপনজন।
– আপনজন বলেই তো প্রতিবছর আমরা সশ্রদ্ধ সম্মানে তাঁদের স্মরণ করি।
এরিমধ্যে টিভিতে বিজয়ের অনুষ্ঠানটির বিরতি চলছে। রমজান আলী স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
– জমিলা, আমার কাজ আমি করেছি। তোমার লিস্ট অনুসারে সব বাজার করে এনেছি। দেখো আর কিছু লাগবে কীনা।
– আমি দেখেছি। সব ঠিকমতো এনেছো। আগামীকাল সকাল থেকে আমি ব্যস্ত হয়ে যাবো। তুমি কাউকে আগে আগে দাওয়াত দিয়েছো কী?
– না, আগামীকাল সকাল থেকে আমার মেহমানদের দাওয়াত দেবো।
– কয়জনকে বলবে?
– যে বাজার করেছি তাতে পঞ্চাশ জনের মতো আয়োজন করা যাবে। তুমি কোন চিন্তা করো না। আমার কাছে আরো সাড়ে তিন হাজার টাকার মতো আছে। মেহমান হিসেবের বেশি হয়ে গেলে আবার বাজার করতে পারবো।
– তোমার চিন্তা চেতনা আমার খুব ভালো লাগে। তোমার মতো করে দেশের সবাই যদি ভাবতো তবে এই দেশে স্বাধীনতার সুফল সহজে ধরা দিতো।
– তুমি আমার কোন দিকটা নিয়ে কথা বলছো?
– ছোটখাটো চাকরি করো। মাস শেষে যে সামান্য বেতন পাও তা দিয়ে আমাদের  সংসার ও স্নেহা মামণির পড়ার খরচ চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। তারপরও একটু একটু করে টাকা জমিয়ে বিজয় দিবস এলে শহীদদের স্মরণে ফকির মিসকিনদের ডেকে খাওয়াও। ঘরে মিলাদ দাও। শহীদদের রুহের মাগফেরাতের জন্য দোয়া করো। দেশের ক’জনে তা করতে পারে।

স্ত্রীর কথা শোনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রমজান আলী বললেন,
– কে কি করলো আর করলো না তা ভাবার দরকার নেই। আমি শুধু এইটুকু ভাবি এদেশে আমার জন্ম হয়েছে। এদেশের আলো বাতাসে আমি বড় হয়েছি। তাই দেশের প্রতি আমারও দায়িত্ব আছে। তুমি আর একটা কথা বললে, আমি ছোটখাটো চাকরি করছি। ছোট হোক বড় হোক চাকরি তো চাকরিই। যার যার অবস্থানে থেকে আমাদের কাজ করা উচিত।
আমার অবস্থানে আমি আর তোমার অবস্থানে তুমি এভাবে সবাই যদি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করি তবে আমাদের দেশের উন্নয়নে কেউ বাঁধা হতে পারবে না। । বিশ্বের বুকে আমরা মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবো।
– হ্যাঁ, আমিও তাই মনে করি।
এই কথা বলে টিভি বন্ধ করে খাবার টেবিলের দিকে চলে আসে সবাই। রাতের খাবার খেয়ে শোবার কক্ষে এসে স্নেহাকে শুইয়ে
দিলেন জমিলা বেগম।
রমজান আলী বাথরুম থেকে বের হয়ে ঘড়ির দিকে চেয়ে নিলেন।
রাত এগারোটা পঞ্চান্ন মিনিট। আর মাত্র পাঁচ মিনিট পর চারিদিকের বিল্ডিং থেকে, প্রধান সড়ক থেকে বিজয়ের আতশবাজি ফাটার আওয়াজে চারিদিক মুখরিত হবে। সেই আনন্দে শরীক হতে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ব্যালকনির  দিকে এগিয়ে আসেন তিনি।
ঘড়ির কাটা ঘুরে বারোটায় আসার সাথে সাথে চারিদিকে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। আতশবাজির শব্দ, বাঁশির সুর, পাশের বাসার টেলিভিশনে বিজয়ের তোপধ্বনির আওয়াজ তাদের কানে বাজে। চারিদিকের পরিবেশ উৎসব উৎসব রবে মুখরিত হয়ে উঠে। রমজান আলী ও তার স্ত্রী বিজয়ের আনন্দে আরও কিছু সময় সেখানে কাটিয়ে ঘরে ফিরে এসে ঘুমিয়ে পড়েন।

পরদিন সকাল থেকে রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন জমিলা বেগম। তাকে তার কাজে সহায়তা করতে পাশের বাসার মুনিয়ার মাও রান্নাঘরে এসে হাজির হয়েছেন।
আর রমজান আলী পায়জামা পাঞ্জাবি পরে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ঘরের বাইরে চলে আসেন। প্রথমে পাশের এতিমখানায় গিয়ে বিশজনের মতো এতিম ছেলেকে পান। এতিমখানার বড় হুজুরসহ সবাইকে দুপুরে খাওয়ার জন্য দাওয়াত দিলেন। এরপর দেখে দেখে গরীব অসহায় আরো ত্রিশজনের মতো দাওয়াত দিয়ে বাসায় ফিরে আসেন।
এতিমখানার বড় হুজুর ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে দুপুর বারোটায় এসে হাজির হন। এরপর সবাই মিলে শহীদদের স্মরণে দোয়া মাহফিল শুরু করেন। মিলাদ শেষে শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করা হয়।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে আরও মেহমানরা আসতে থাকেন। খুব আতিথেয়তার মধ্য দিয়ে তাদের খাবার পর্ব শেষ করেন।
অতিথিরা বিদায় নিয়ে চলে যাবার পর রমজান আলী আসরের নামাজ আদায় করেন।
নামাজ পড়া শেষ হলে মোনাজাতে খোদার দরবারে শোকরিয়া জ্ঞাপন করেন। শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। নিজেকে একজন খাঁটি মুসলমান বাঙালি হয়ে বাকী জীবন এভাবে কাটিয়ে দিতে খোদার কাছে প্রার্থনা করেন।

পরিচিতি :
নাম : কবির কাঞ্চন
জন্ম : ১ জুন ১৯৮৫
কবি, গল্পকার, গীতিকার ও প্রাবন্ধিক
সহকারী শিক্ষক
বর্তমান ঠিকানা : বেপজা পাবলিক স্কুল ও কলেজ চট্টগ্রাম,  সি ইপিজেড, ইপিজেড, চট্টগ্রাম।
স্থায়ী ঠিকানা :  আফাজিয়া বাজার, হাতিয়া, নোয়াখালী।
পেশা : শিক্ষকতা
প্রকাশিত গ্রন্থ : ১২
টি
মুঠোফোন : 📞 ০১৬৭৩-৯০৩৫০৩️️✡️
০১৯৬০০৯০৭৭৬
email: kabirctg1985@gmail.com
‎ফেসবুক : কবির কাঞ্চন

error: Content is protected !!