নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হয়েও একের পর এক ভুল করেছেন আশরাফুল

প্রকাশিত: ৩:০৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০২০

নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হয়েও একের পর এক ভুল করেছেন আশরাফুল

বিশ্ব ক্রিকেটের বিস্ময় বালক মোহাম্মদ আশরাফুল। ২০০১ সালে মাত্র ১৭ বছর ৬১ দিনে শ্রীলংকার বিপক্ষে সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে অভিষেকেই টেস্ট সেঞ্চুরী করে শুরু করা আশরাফুলের বয়স এখন ৩৬ বছর ১৬০ দিন (১৪ই ডিসেম্বর পর্যন্ত) দিন হলেও আশরাফুলকে নিয়ে তার ভক্তদের আগ্রহ অনুভ‚তি কমেনি বিন্দুমাত্রও। বরং নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হয়ে পুনরায় জাতীয় দলে ফেরার স্বপ্ন দেখা আশরাফুলের ভক্তরাও অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছেন প্রিয় ক্রিকেটারকে আবারো জাতীয় দলে দেখতে।

 

দেশের হয়ে আশরাফুলের অবদান কিংবা ধারাবাহিক রান করতে না পারা সহ ২০০১ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত চলমান থাকা আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। আমার এ লেখার উদ্দেশ্য ২০১৩ সালে ফিক্সিং কান্ডে ৫ বছরের পূর্ণ ও ৩ বছরের প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা পাওয়া আশরাফুল ২০১৬ সালে ৩ বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরার পর এ পর্যন্ত মাঠের ক্রিকেটে কতটুকু খেলেছেন এবং জাতীয় দলে ফেরার জন্য কি করছেন না করছেন সেসব বিষয় নিয়ে।

 

৩০ বছর (কম/বেশী) বয়সে একজন ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা পেলে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার, এমনকি পুরো ক্রিকেট ক্যারিয়ার কার্যত শেষ হয়ে গেছে মর্মে ধরা যায়। কেননা ৫ বছর বয়সে ফিরে খুব বেশি কিছু করার থাকে না। তবে আশরাফুল দেশের ক্রিকেটের প্রথম সুপারস্টার এবং দেশ-বিদেশে বিখ্যাত একজন ক্রিকেটার বলেই পুনরায় জাতীয় দলে ফেরার স্বপ্ন দেখেছেন আশরাফুল এবং তার ভক্তরা।

 

আশরাফুলকে ৮ বছর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া এবং পরবর্তীতে ৩ বছর কমিয়ে ৫ বছরে আনা এবং ৩ বছর পরেই ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরতে পারা ছিলো আশরাফুলের জন্য বড় সুযোগ। যারা এখন বলেন আশরাফুলের ক্যারিয়ার শেষ করে দেওয়া হয়েছে তারা, কখনোই ভাবেন না। ২০১৩ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে নিষেধাজ্ঞা পেয়ে মাত্র ৩ বছর পর অর্থাৎ ৩২ বছর বয়সে স্বীকৃত ক্রিকেটে ফিরতে পারার মানেই হলো পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা তথা ৩৪ বছর বয়সে পুনরায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার সুযোগ তৈরী হওয়ার মধ্যেই নিজেকে প্রমাণের যথেষ্ট সুযোগ ছিলো আশরাফুলের সামনে। কিন্তু আশরাফুল কি করেছেন এই সময়ে, সেসব বিষয়েও আলোচনা করবো।

 

২০১৬ সালে প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হয়ে ২০১৬/১৭ সালের জাতীয় লীগ থেকে ২০২০ সালের বঙ্গবন্ধু কাপ পর্যন্ত আশরাফুলের ব্যাটিং পরিসংখ্যান-
জাতীয় লীগ-
২০১৬/১৭ থেকে ২০১৯ সালের জাতীয় লীগ পর্যন্ত জাতীয় লীগে ২০ ম্যাচে খেলে ১৫০ রান বেস্টে ২ সেঞ্চুরী ৩ ফিফটিতে ৯০১ রান করেছেন।

 

বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগ (বিসিএল)-
২০১৮ ও ২০১৯ সালের বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগ-বিসিএলে ৭ ম্যাচে ১৩৭ রান বেস্টে ১ সেঞ্চুরী ও ৪ ফিফটিতে ৫২৫ রান করেন।

জাতীয় লীগ ও বিসিএল মিলিয়ে ২৭টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলে ৩ সেঞ্চুরী ৭ ফিফটিতে ১৪২৬ রান করেন।

 

ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ-

২০১৭ সাল থেকে ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে খেলা শুরু করা আশরাফুল সর্বশেষ চলতি বছর করোনা ভাইরাসের কারনে স্থগিত হওয়া ঢাকা লীগে ১ ম্যাচ সহ ৩৭ ম্যাচ খেলে ১২৭ রান বেস্টে ৫ সেঞ্চুরী ও ৫ ফিফটিতে ১১৮৩ রান করেন।

২০১৮ সালের ঢাকা লীগে রেকর্ড ৫ সেঞ্চুরী করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন আশরাফুল। ব্যাট হাতে নিজের সামর্থ্যরে জানান দেন দারুণ ভাবে।

বিপিএল, বঙ্গবন্ধু টি-২০ কাপ ও ডিপিএল টি২০ লীগ-
২০১৯ সালে বিপিএল, বঙ্গবন্ধু কাপ ও ডিপিএল টি২০ লীগ সহ ১০ ম্যাচ খেলে ১০৩ রান করেছেন, সর্বোচ্চ ২৩ বলে ২৫ রানের ইনিংস।

 

আশরাফুলের ভুলের ফিরিস্তি-
ক্রিকেট চাপমুক্ত থেকে পারফর্ম করার খেলা। নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হয়ে অনেক দিন পর স্বীকৃত ক্রিকেটে খেলছেন, এটিই চাপের বিষয়। কিন্তু সেই সাথে মিডিয়ার সাথে অতিরিক্ত কথা বলা, জাতীয় দলে ফিরতে চাই, ভক্তদের জন্য ফিরবো। এই ধরনের মন্তব্য তিনি করেছেন প্রতিটি লীগের পূর্বেই। আশরাফুল মাঠের খেলার চেয়েও “মিডিয়া ট্রায়াল” এ ব্যস্ত ছিলেন বেশি। মিডিয়াও লুফে নিয়েছে আশরাফুলের মন্তব্যগুলো। সেই সাথে মিডিয়া আশরাফুল থেকে জাতীয় দলে ফেরা সম্পর্কিত প্রশ্নই করেছে বেশি। আশরাফুলও নিজের অনুভ‚তি প্রকাশ করেছেন প্রাণ খোলে। এর মাধ্যমে যে তিনি নিজের উপর চাপ নিয়ে ফেলছেন বেশি, সে বিষয়টি নিজে উপলব্ধি করেননি কিংবা তার কাছের মানুষ, শুভাকাঙ্খিরাও তাকে সতর্ক করেনি বিষয়টি নিয়ে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে, ঢাকা লীগে ২০১৮ সালে ৫টি সেঞ্চুরী ব্যতীত আর কোন লীগেই সেরা পারফর্ম করতে পারেননি।

 

প্রতিটি টুর্নামেন্ট শুরুর পূর্বেই আশরাফুল আশরাফুল মাঠের খেলার চেয়েও “মিডিয়া ট্রায়াল” এ ব্যস্ত ছিলেন বেশি। কিন্তু মাঠের কাজটা ঠিকমতো করতে পারেননি। অথচ মাঠের সফলতা দেখিয়েই জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে হয় কিংবা নির্বাচকদের সুনজরে আসতে হয়। কিন্তু সেখানে ব্যর্থ ছিলেন আশরাফুল। ফলে ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত কোন লীগেই নজরপাড়া পারফর্ম করতে পারেননি। লীগ শুরুর পূর্বে ভালো খেলতে চাই, ভক্তদের জন্য ফিরতে চাই, এই ধরনের কথা বলার পর লীগে ব্যর্থ হয়েও সংযত হননি আশরাফুল, পরবর্তী লীগের পূর্বের আবারো মিডিয়া ট্রায়ালে ব্যস্ত ছিলেন এবং ফলাফল পূর্বের মতোই। সর্বশেষ বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ ২০২০ পর্যন্ত চলেছে নিয়মে।

 

বাংলাদেশ ওয়ানডে দল যথেষ্ট শক্তিশালী এখন, টি২০ দলটি ধারাবাহিক না হলেও এখানে তরুণদের ভীরে আশরাফুলের সুযোগ নেই। আশরাফুল পুনরায় ফিরতে পারলে সেটি টেস্ট ফরম্যাটে, এমনটি নিজেও জানিয়েছেন। কিন্তু আশরাফুল বিপিএল কিংবা বঙ্গবন্ধু টি২০ কাপকে কেনো জাতীয় দলে ফেরার সিঁড়ি নির্ধারণ করেছেন, তাও বোধগম্য নয়। হতে পারে টি২০ লীগগুলো টিভিতে সম্প্রচার করে, ভালো খেলতে পারলে আলোচনায় আসা যায়। কিন্তু এ আলোচনার প্রয়োজন আশরাফুলের মতো পুরনো ক্রিকেটারদের জন্য নয়, তরুণদের জন্য হতে পারে। বিসিবি কর্তৃক আয়োজিত জাতীয় লীগ, বিসিএল কিংবা ঢাকা লীগেও নজর থাকে নির্বাচকদের। কাজেই জাতীয় দলে ফিরতে চাই বলে টি২০ ফরম্যাটকে টার্গেট করা ঠিক হয়নি আশরাফুলের জন্য।

 

আরো একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, চলতি বঙ্গবন্ধু টি২০ লীগ শুরু হওয়ার পর লকডাউনের সময় থেকে দীর্ঘদিন কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের ফিটনেসের যথেষ্ট উন্নতি করেছেন আশরাফুল। আশরাফুলের বর্তমান ফিটনেস আন্তর্জাতিক মানের। কোচও জানিয়েছেন ফিটনেস সন্তোষজনক। কথা হলো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরতে পারফরম্যান্সের আগেও ফিটনেসের উন্নতি বেশি প্রয়োজন। এটি আশরাফুল জানেন আগে থেকেই। তাহলে কেনো তিনি ২০১৬ সালে প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হওয়ার আগ থেকেই নিজের ফিটনেস বর্তমানের মতো করতে পারেননি বা করেননি। এ প্রশ্ন এখন সহজেই সামনে চলে আসে।

 

ভক্তরা ক্রিকেটারদের প্রাণ, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া কিংবা ফেরার জন্য যে কাজ বেশি প্রয়োজন তা হলো ফিট থাকা এবং পারফর্ম করা। এ কাজটি ক্রিকেটারদেরই করতে হয়, কিন্তু আশরাফুল নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ভক্তদের সাথে এতো বেশিই সংযুক্ত ছিলেন যে, তিনি কোন লীগের কোন ম্যাচের একাদশে থাকবেন কিনা, সে বিষয়ে ভক্তদের জিজ্ঞাসার উত্তরও দেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন অনেক গ্রæপে কিংবা ব্যক্তিগত আইডিতে পোষ্ট দিয়ে অনেক ভক্ত সমর্থক সময়ে সময়ে লিখেছেন যে, “ভাইয়ের সাথে কথা হয়েছে আগামী ম্যাচের একাদশে থাকবেন আশরাফুল ভাই, আলহামদুলিল্লাহ”। আশরাফুল কেনো ভক্তদের সাথে ম্যাচের বিষয় নিয়ে কথা বলবেন, এ বিষয়টি বোধগম্য নয়। ক্রিকেটারকে মাঠে সুযোগ করে দেয় ফিটনেস ও পারফরম্যান্স, ভক্তদের চাওয়া পাওয়া নয়। কিন্তু জাতীয় দলে ফিরতে মরিয়া আশরাফুল কেনো ভক্তদের সাথে এতো যোগাযোগ কিংবা মিডিয়া ট্রায়ালে ব্যস্ত ছিলেন, সে উত্তর আশরাফুলের কাছেই থাকবে হয়তো, অন্য কারোর জানা নেই।

 

এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, ফিক্সিং পরবর্তী সময়ে ভক্তদের যথেষ্ট সমর্থন পেয়েছেন আশরাফুল। হতাশার সময়গুলো ভক্তরা তাকে সহজ জুগিয়েছে, পাশে থেকেছে। কিন্তু যখন ২০১৬ সালে প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা শেষে মাঠে ফিরেছে আশরাফুল, তৎপরবর্তী সময়ে তাকে শুধুমাত্র খেলাতেই মনোনিবেশ হয়ে অন্য সব থেকে দূরে থাকার দরকার ছিলো। কিন্তু তিনি সেটা করতে পারেননি। ফলে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হওয়ার পূর্বে ২টি জাতীয় লীগ, ২টি ঢাকা লীগ খেললেও এবং পরবর্তীতে ২টি জাতীয় লীগ, ২টি ঢাকা লীগ, ২টি বিসিএল, বিপিএল, বঙ্গবন্ধু টি২০ লীগ মিলিয়ে মিডিয়াতে যেভাবে মন্তব্য করেছেন, তার ছিটেফোঁটাও মাঠে করে দেখাতে পারেননি।

 

সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু কাপে ব্যর্থতার পর জাতীয় দলের সাবেক উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান আশরাফুলের দীর্ঘদিনের সর্তীথ খালেদ মাসুদ পাইলটও বলেছেন মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে আশরাফুলের চাপ নেওয়া উচিত হয়নি। এটি শুধু পাইলটের কথাই নয়, সকলেরই কথা। কিন্তু বুঝেনি আশরাফুল, কেউ বুঝায়নি আশরাফুলকে। এমনকি এক্ষেত্রে তার পরিবার, শুভাকাঙ্খিরাও তাকে বুঝতে পারেননি কিংবা বুঝালেও বুঝতে চাননি আশরাফুল।

 

নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী সময়ে মাঠের খেলা নিয়ে আশাবাদী না হওয়ার মতোও সুযোগ নেই। কেননা এই সময়ে তিনি টি২০ ফরম্যাট ব্যতীত প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ ও লিষ্ট এ ম্যাচে রান করেছেন। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৩ সেঞ্চুরী ৭ ফিফটি, লিষ্ট এ ক্রিকেটে ৫ সেঞ্চুরী ৫ ফিফটি করেছেন। তবে সেটি নিষেধাজ্ঞা পূর্ববর্তী সময়ে যে মান অনুযায়ী খেলেছেন সে মান বজায় ছিলো। কিন্তু ৭ বছর আগের ক্রিকেট এবং সে সময়ের বাংলাদেশ দলের তুলনায় বর্তমান বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটের মান, অবস্থান বিবেচনায় আশরাফুল ২টা শতক করলেই দলে নিয়ে নেবে, সেই অবস্থায় নেই। তাছাড়া ফিক্সিং ঘটনার পর তাকে আর কখনোই সুযোগ দেওয়া উচিত নয়, এমন মতামত প্রদানকারীর সংখ্যাও কম নয়। তারা আশরাফুল বিদ্বেষী নয়, তবে বাংলাদেশ ক্রিকেটে একটা রীতি প্রতিষ্ঠিত হোক যে, ফিক্সিং করে কোনমতেই ছাড়া পাওয়া যাবে না, যায়নি। তবে আশরাফুল পুনরায় জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়া, অন্তত অবসর নিতে পারেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে, এমন একটি ম্যাচে সুযোগ পাওয়ার জন্য হলেও তাকে সবার সেরা পারফর্ম করতে হবে, এটি অনুমেয়ই ছিলো। কিন্তু পারেননি আশরাফুল। ২০১৮ সালের ঢাকা লীগ ব্যতীত কোন লীগেই ধারাবাহিক রান করতে পারেনি।

 

করণীয় কি ছিলো-
২০১৬ সালে প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরা আশরাফুলের প্রয়োজন ছিলো শুধুই ঘরোয়া ক্রিকেটে মনযোগী হওয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরতে চাওয়ার বিষয়ে মিডিয়ায় কোন মন্তব্য না করা। বিশেষ করে কোন লীগ শুরুর পূর্বে দলের জয়ে অবদান রাখতে চাই। নিজে ভালো খেলতে চাই, এতোটুকু মন্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকা। কিন্তু আশরাফুল যেভাবে জাতীয় দলে ফিরতে চাই ¯েøাগান তুলেছেন, তা বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে সর্বত্র। এর মাধ্যমে তিনি অদৃশ্য ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তার কাছে লীগগুলোতে দলের জয়/সফলতা অর্জনের জন্য খেলার চেয়েও নিজের জন্য খেলতে নামছেন আশরাফুল। এটিই বেশি প্রমাণিত হয়েছে। প্রথম শ্রেণী কিংবা লিস্ট এ ক্রিকেটে আশরাফুল তার স্বাভাবিক খেলা খেলতে পারলেও। টি২০ ক্রিকেটে মেরে খেলতে ব্যর্থ হওয়া আশরাফুলের খেলা দেখে সহজেই বলা যায়, আশরাফুল নিজের জন্য খেলছেন দলের জন্য নয়। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই বিপিএলে ২ ম্যাচ খেলেই বাদ পরতে হয়েছে তাকে। ২য় সুযোগটা শেষে পেলেও চরম ব্যর্থ ছিলেন। হতাশ হয়ে পরেছেন বললেও, তার মতো ক্রিকেটার দলে সুযোগ না পেলেই হতাশ হতে হবে, এটি কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা জাতীয় দলে সুযোগের আশায় কিংবা পুনরায় ফেরার আশায় বহু ক্রিকেটার ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলছেন, কিন্তু তারা কখনোই এতোটা মরিয়া হয়ে কথা বলেননি মিডিয়ায়। বরং আড়ালে থেকে নিজের কাজটা ঠিকমতো করেছেন।

 

বর্তমানে ৩৬ বছর ১৬০ দিন চলছে আশরাফুলের। বিগত ৪ বছর পূর্বে ২০১৬/১৭ সালে জাতীয় লীগে ফেরার পর যে সুযোগ ছিলো কিংবা ২০১৮ সালে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা মুক্ত হয়েও যে সুযোগ ছিলো, তার অর্ধেকেরও বেশি সুযোগ কমে গেছে এখন।

 

বঙ্গবন্ধু কাপে ব্যর্থ হয়ে আশরাফুল পরবর্তী কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন জানি না, তবে তিনি যদি এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার স্বপ্নটা লালন করে থাকেন, তাহলে তাকে মিডিয়ায় কথা বলা বাদ দিতে হবে। যে দলের হয়ে খেলবেন সে দলের জন্য অবদান রাখাতে মনযোগী হতে হবে এবং নিজের অধারাবাহিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জাতীয় লীগ কিংবা বিসিএলে ৫ শতাধিকের বেশি রান করতে হবে এবং পরবর্তী আরেকটি টুর্নামেন্টেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। টি২০ লীগে সামনে যদি কখনো দল পানও, সেটা নিয়ে বাড়তি কথা না বলে কিংবা জাতীয় দলে ফেরার সিঁড়ি নির্ধারণ না করে প্রতিটি ম্যাচেই মেরে খেলতে হবে। এখানে ব্যর্থ হওয়া বা সফল হওয়া বড় কথা নয় ও ছিলো না পূর্বেও। কেননা টি২০ লীগে পারফর্ম করলে নিজের টি২০ সামর্থ্যটা আবারো প্রমাণ হবে হয়তো, কিন্তু টি২০ ম্যাচে পারফর্ম করে টেস্ট দলে ফেরার স্বপ্ন বৃথা। আর জাতীয় ওয়ানডে/টি২০ দলে আশরাফুলের বিন্দুমাত্র প্রয়োজনীয়তা আছে বলে নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী সময় থেকেই মনে হয়নি। এখন তো অবশ্যই নয়।

 

আশরাফুল ২০১৬/১৭ জাতীয় লীগ থেকে অনেক সুযোগ পেয়েছেন নিজেকে প্রমাণের জন্য, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন। ঢাকা লীগের রানকে উল্লেখযোগ্য বললেও ঢাকা লীগে খেলার সময় তার যে ফিটনেস ছিলো তা আন্তর্জাতিক মানের নয়, এটি পরবর্তীতে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। ফলে আশরাফুল নিজেকে পূর্ণ প্রস্তুত করার পাশাপাশি পারফর্ম করতে পারেননি, এটি স্পষ্ট বিষয়।

 

আশরাফুল আর জাতীয় দলে ফিরছেন না কখনোই, এটি অনেকটাই এখন নিশ্চিত হয়ে গেছে। কেননা তিনি মাঠের খেলার চেয়েও বেশি মনযোগী মিডিয়ায় মন্তব্য করাতে। এটি তার জন্য কতটা ক্ষতিকর ছিলো ও হয়েছে, আশা করি তিনি অনেক অনেক দেরিতে হলেও বুঝতে পারবেন কিংবা ইতিমধ্যেই পেরেছেন।

 

বাংলাদেশ ক্রিকেটে আশরাফুলের অবদান আছে, এটি অস্বীকার কেউ করেনি এতোদিন, এখনোও করছে না। এই অবদান স্বরূপ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায়ের জন্য একটি মাত্র ম্যাচে সুযোগ পেয়ে সসম্মানে অবসর নেয়ার শেষ সুযোগটাই এখন কিছুটা বাকি আছে আশরাফুলের সামনে। তার জন্যও ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে। ৩ বছর বয়সী আশরাফুল যদি সে চেষ্টাটা করেন সামনেও তাহলে পরবর্তী ঢাকা লীগ, জাতীয় লীগ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগ অর্থাৎ পরবর্তী ২টি লীগের মধ্যেই কিছু একটা করতে হবে, যা হবে সবার সেরা সফলতা। তবেই যদি অবসরের জন্য একটি ম্যাচ পান তিনি এবং এটিই হবে তার নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফসল।

 

লেখক
জুবায়ের আহমেদ
কলামিষ্ট ও প্রাবন্ধিক

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget
error: Content is protected !!