নষ্টদের দখলে প্রযুক্তি

প্রকাশিত: ১২:২০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৭, ২০২০

নষ্টদের দখলে প্রযুক্তি

জুবায়ের আহমেদ:

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশ। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকার আছে নিজেদের ভালোমন্দ যেকোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার। রাষ্ট্র বিরোধী কিংবা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত না করে কিংবা জন বিশৃঙ্খলা তৈরী হয় এমন কাজ করা থেকে বিরত থেকে যেকোন নাগরিকই নিজেদের ভালো-মন্দ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কাজকর্ম করতে পারে। এতে কারো কোন বাধা নিষেধ না থাকলেও প্রযুক্তির উন্নতি সাধনের সাথে সাথে মানুষের কর্মকান্ডও নীতি নৈতিকতার সীমা লঙ্ঘন,ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং প্রচলিত ধ্যান ধারণাবিরোধী কর্মকান্ড বেড়ে দেশ ও সমাজে বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। প্রযুক্তিতে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও তা জনকল্যাণকর ও ইতিবাচক কাজে ব্যয় না করে হুজুগে বাঙ্গালীদের উম্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের খেয়াল খুশি মতো ব্যবহার করছে অনেকেই।

 

প্রযুক্তির যত অসাধারণ সৃষ্টি আছে তার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউব অন্যতম। সেই সাথে লাইকি, ইমু, টিকটক সহ অসংখ্য ই-প্রতিষ্ঠান জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ফেসবুক, ইউটিউব ও ইমুর ইতিবাচক ব্যবহার থাকলেও লাইকি-টিকটক ও এই ধরনের অ্যাপসগুলোতে অশ্লীলতা-ফানি কর্মকান্ড ব্যতীত ভালো কোন কাজ করার সুযোগ নেই বললেই চলে। ফেসবুকের মাধ্যমে লেখালেখি করে যেকোন বিষয়ে আবেগ অনুভূতি প্রকাশ করা, প্রিয়জনদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন সহ ব্যবসা করার জন্য ফেসবুকের জুড়ি নেই। পাশাপাশি ইউটিউবও ব্যবসার কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে শতভাগ। ইউটিউব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, পেশাদার মিডিয়া কর্মী কিংবা যেকোন মাধ্যমের সফল ব্যক্তিত্বরা তাদের ইতিবাচক কাজকর্মের মাধ্যমে ভিউয়ার্সদের আকৃষ্ট করার চেষ্টায় মগ্ন থাকলেও এটি সবার জন্য উম্মুক্ত প্লাটফর্ম হওয়ার কারনে কোন বিষয়ে ন্যুনতম যোগ্যতা নেই এমন ব্যক্তিও যা ইচ্ছা তাই বলার মাধ্যমে কিংবা নাচ-গান সহ যে বিষয়ে তার মন চায়, সে বিষয়েই ভিডিও তৈরীর মাধ্যমে আকৃষ্ট করছে ভিউয়ার্সদের। তাদের কাজগুলো ইতিবাচক না হওয়া এবং আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির জন্য আদর্শ না হলেও শুধুমাত্র ভিউয়ার্সরা লুফে নেয়ার কারনে তাদের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে অর্থাৎ ভিউয়ার্সের মাধ্যমেই জনপ্রিয়তা অর্জন এবং আয় রোজগারের সুযোগ থাকায় তারা স্বঘোষিত তারকায় পরিণত হচ্ছে।

 

হুজুগে বাঙ্গালী বলে আমরা বাংলাদেশী নাগরিকদের প্রতি মন্তব্য ছুড়ে দেই আমরাই। এর কারন হলো আমরা কোন কিছু যাচাই বাছাই না করেই ছড়িয়ে দেই, ভালো না মন্দ তার খোঁজ না নিয়ে শুধুমাত্র অন্যকেউ বলেছে বা বলছে, তার উপর ভিত্তি করেই আমরা প্রচার করি। প্রযুক্তির উন্নতিসাধনের পূর্বে এসব কর্মকান্ড এলাকাভিত্তিক সীমাবদ্ধ থাকলেও তা এখন দেশব্যাপী এবং দেশের গ-ি ছাড়িয়ে পৃথিবীব্যাপী জড়িয়ে পরছে। তবে দুঃখজনক বিষয় আমাদের দেশের নাগরিকদের ইতিবাচক কর্মকান্ডগুলো ছড়ায় কম, কারণ সেগুলোতে এই হুজুগে বাঙ্গালীর মনোরঞ্জনের জন্য কিছু থাকে না বলেই। অবশ্য এটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বহু ভালো কাজও হচ্ছে নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রচার-প্রচারনার কারনে, তবে তা খুবই কম। বিপরীতে মন্দ কাজ এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য-দেশীয় সংস্কৃতি বিরোধী কাজের প্রচার প্রচারনাই বেশি হচ্ছে। ইউটিউবাররা নিজেদের কন্টেন্টের ভিউ বাড়াতে মিথ্যা তথ্য প্রদান সহ ভুল মতমাত প্রদানের মাধ্যমে বিভ্রান্ত করছে জনসাধারণকে। আমাদের দেশে প্রতিটি মাধ্যমেই ভালো কাজ হচ্ছে প্রচুর, ইতিবাচক কাজের মাধ্যমে সফলতা অর্জনের লড়াই করছে বহু তরুণ-তরুণী। কিন্তু ভালোটা আড়ালে থাকে বিধায় মন্দকাজগুলোই আমাদের দেশের সংস্কৃতির মানদন্ড হিসেবে প্রচার হচ্ছে বিশ্বব্যাপী।

 

বাংলাদেশের মূলধারার মিডিয়া আছে, যেখানে নাচ-গান-সিনেমা নির্মাণ হয়। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য আছে। সামাজিক-ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের দাম আছে। নাগরিকদের মধ্যে দল কিংবা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বিভক্তি থাকলেও দেশীয় ও ধর্মীয় সংষ্কৃতির বিষয়ে খুব বেশি বিরোধ নেই। কিন্তু সবার জন্য উম্মুক্ত ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে সমাজ, সংষ্কৃতি ও শালীনতা-ঐতিহ্যবিরোধী কাজ করা লোকজনের সংখ্যা এতোই বাড়ছে যে, প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে সবকিছু যেনো নষ্টদের দখলে চলে যাচ্ছে। আজকাল শুধুমাত্র ভিউয়ার্স এর উপর ভিত্তি করে সবাই তারকা, না থাকুক যোগ্যতা, তাতে কি। যে কেউ আজকাল মডেল হচ্ছে, নায়ক হচ্ছে, শিল্পী হচ্ছে, তাতে বাধা দেওয়ার কেউ নেই। তাদের নিজেদের বিবেকও বাধা দেয় না, কারন তারা ভিউয়ার্স এর সংখ্যায় তারকা হতে ব্যস্ত। হোক মন্দকাজ, পরিচিতি পেলেই বাজিমাত, হয়ে গেলাম ফেমাস। টাকা রোজগারের জন্য এতোটাই নিচু কাজে লিপ্ত হচ্ছে এক শ্রেণীর মানুষ। তাদেরকে কেউ বাধা না দেয়ায় এবং তারা মনে করছে তাদের কাজকর্ম সব সঠিক এবং মানুষ গ্রহণ করছে মানেই আমরা প্রকৃত তারকা।

 

ভালো অভিনয় করতে পারে কিংবা ভালো গান গাইতে পারে, এমন প্রতিভাবানরা চেষ্টা করতো কিভাবে সুযোগ করে নেওয়া যায়। সুযোগ করে নিলেও চিন্তা থাকতো মানুষজন গ্রহণ করবে কিনা। পাশাপাশি প্রতিভাবানদের খোঁজে নিতো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রযোজকরা এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মাধ্যমেও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে উঠে আসতে হতো। কিন্তু উম্মুক্ত প্রযুক্তির কল্যাণে সেসবের বালাই নেই। আমার চ্যানেল আছে তো আমি শিল্পি, আমি অভিনেতা। আমার ক্ষমতা আছে তো আমার শখ জেগেছে গান গাইবো, অভিনয় করবো। এভাবেই চলছে। ন্যুনতম যোগ্যতা আছে কিনা, তার খবর নেই। অবশ্য দ্-ুএকবার শখের বসেই কেউ কোন কিছু করলে দোষের নয়। তবে যোগ্যতা না থাকা স্বত্বেও নিয়মিত করে যাওয়া কাম্য নয়। এসব স্বঘোষিত তারকাদের কর্মকান্ডগুলো সকলে কৌতুক হিসেবে গ্রহণ করলেও এসব তারকা নিজেদেরকে কৌতুক অভিনেতা/শিল্পী মনে করে না। তারা অন্য আট-দশজন মূলধারার সফল ব্যক্তিত্বের মতোই নিজেদের মনে করেন। এদেরকে রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রতিহত করার তেমন সুযোগ না থাকলেও সাধারণ নাগরিকদের জায়গা থেকে তাদেরকে বর্জনের জন্য শুধুমাত্র তাদের কর্মকান্ডের ভিউয়ার/দর্শক না হলেই যথেষ্ট। পাশাপাশি সেসকল স্বঘোষিত তারকাদের বোধোদয় হওয়া এবং মূলধারার মিডিয়াকর্মীরা নিজেদের কাজ বাড়িয়ে দেওয়া সহ অপ-সংস্কৃতিকেই যেনো সু-সংষ্কৃতি হিসেবে কেউ গন্য না করে এবং গ্রহণ না করে তার জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান জরুরী।

 

শিক্ষার্থী
ডিপ্লোমা ইন জার্নালিজম
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম)
কাটাবন, ঢাকা।

 

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget
error: Content is protected !!