খাদ্য ভেজাল ও ভোক্তাদের অধিকার

প্রকাশিত: ১০:৫৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩, ২০২০

খাদ্য ভেজাল ও ভোক্তাদের অধিকার

বর্তমানে মানুষ ক্রমাগত যান্ত্রিক জীবনের দিকে ধাবিত হওয়ার ফলে বিবেকহীন এবং স্বার্থপর হয়ে পড়ছে। একজন অন্যজনকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে এবং অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। একে অন্যের তরে জীবন বিলিয়ে দিয়ে মানবতার যে মহান দৃষ্টান্ত এক সময় প্রতিষ্ঠিত হত, কালের বিবর্তনে সেই মানুষ আজ নিজের সামান্য কিছু স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অন্যের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে কুন্ঠিতবোধ করছে না। অভিনব পদ্ধতিতে প্রতরণার ফাঁদ পেতে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন অনেকেই। তারই মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি মৃত্যুকূপ হলো ভেজাল খাদ্যের দৌরাত্ম্য। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রায় অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও ভেজালের প্রাদুর্ভাব থেকে সমাজকে মুক্ত করা যায়নি। ভেজালের এ সমাজে এখন চলছে ভেজালের ‘মুক্ত বাণিজ্য’। এর খপ্পরে পড়ে ভোক্তাদের অধিকার হচ্ছে ভুলন্ডিত। যে যেভাবে পাচ্ছে অন্যের ক্ষতি করে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করার নেশায় মেতে উঠছে। কেউবা আবার খাদ্য সন্ত্রাসীতে পরিণত হচ্ছে। যেহেতু সমাজের আমরা সবাই কোন না কোন ভাবে নিজে ভোগ করার জন্য পণ্য ক্রয় করি তাই আমরা সবাই ভোক্তা। বিষয়টা বাস্তুসংস্থানের ন্যায়; প্রত্যেকেই কোন না কোন পক্ষের উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিভর্রশীল।
বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্য দরকার তেমনি সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ খাদ্য অপরিহার্য। তাই ভোগের প্রত্যেকটি বস্তু হওয়া চাই নিরাপদ ও নির্ভেজাল। প্রত্যেক ভোক্তার নিরাপদ পণ্য বা সেবা প্রাপ্তির অধিকার রয়েছে। পণ্য ক্রয়ের পূর্বে পণ্যটির উৎপাদনের তারিখ, মূল্য, এর কাঁচামাল এবং প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশ কিংবা পণ্য সর্ম্পকিত বিভিন্ন প্রয়োজনীয় প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার রয়েছে। কিন্তু কোন বিক্রেতা যদি উত্তর না দেয় বা অসমর্থ হন, তখন ভোক্তা অধিকার ক্ষুুণœ হয়। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ স্বীকৃত ভোক্তা অধিকার ৮টি। এগুলো হলো- মৌলিক চাহিদা পূরণের অধিকার, তথ্য পাওয়ার অধিকার, নিরাপদ পণ্য বা সেবা পাওয়ার অধিকার, পছন্দের অধিকার, জানার অধিকার, অভিযোগ করা ও প্রতিকার পাওয়ার অধিকার, ভোক্তা অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা লাভের অধিকার, সুস্থ পরিবেশের অধিকার। একটা সময় খুব কম সংখ্যক লোক ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। কিন্তু এখন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এর অধিক তৎপরতা এবং এ সংক্রান্ত আইন হওয়ার পর ক্যাব, ‘সিসিএস’, ‘সিওয়াইবি’ ও গণমাধ্যমের জনসচেতনতামূলক প্রচারে ভোক্তারা অবগত হচ্ছেন। এখন বিপুল সংখ্যক ভোক্তা তাদের নিজের অধিকার বুঝে নিচ্ছেন। ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণয়ণ করে এবং তা কার্যকর হয় ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল থেকে। এ আইনের ফলে কোন ভোক্তা পণ্য ক্রয়ে পণ্যের ওজন, পরিমাণ, উপাদান, মূল্যসহ কোন বিষয়ে প্রতারিত হলে প্রতিকার পেয়ে থাকেন। এখন ভোক্তাদের আস্থা বেড়েছে যে অভিযোগ করলে প্রতিকার পাওয়া যায়। এজন্য জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্রে প্রতিনিয়ত অভিযোগ পাওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। ফলে ভোক্তা ঠকানোর প্রবণতা হৃাস পাচ্ছে। এখন উৎপাদনকারী ও বিক্রেতারা অবগত, ক্রেতা ঠকিয়ে লাভবান হওয়া যাবে না। ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে সর্বস্তরের মানুষ একটুখানি সচেতন হলে নিরাপদ খাদ্য ও ভেজালমুক্ত দেশ গড়া সম্ভব হবে।

 

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে বর্তমানে অনলাইনে কেনাকাটা করতে অনেকেই স্বাছন্দ্যবোধ করেন। কিন্তু ওয়েবসাইটে পণ্যের যে মান প্রদর্শিত হয়, হাতে পাওয়ার পর দেখা যায় বর্ণিত বৈশিষ্ট্য বা মান যথার্থ নেই। এটি নিঃসন্দেহে একটি সাংঘাতিক প্রতারণা যেটির সাথে অনেক আধুনিক মানুষ পরিচিত আছেন। বাজারে আমরা প্রায়ই দেখি ওজনে বা ওজন যন্ত্রে কারচুপি। পণ্যের গায়ে পণ্যের উৎপাদন, বিক্রয়মূল্য, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ, পণ্যের কার্যকারিতা ইত্যাদি না লিখে পণ্য উৎপাদকরা ভোক্তাকে ঠকাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। তাই ভোক্তাকে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন’ সম্পর্কে জানাতে হবে এবং নির্ধারিত পন্থায় অভিযোগ দায়ের করে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য নির্মূল করতে হবে নচেৎ প্রতারিত হওয়ার সংখ্যা কমবে না।

 

মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম প্রধান এবং প্রথম হলো খাদ্য। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য বিশুদ্ধ খাবারের কোন বিকল্প নেই। কারণ ভেজালমিশ্রিত খাদ্যের মাধ্যমে স্বাস্থ্যহানিসহ নানবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়। অথচ বর্তমানে বিশুদ্ধ খাবার খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজারের কোন কিছুই আজ ভেজালমুক্ত নয়। ফসল আহরণ থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর বিভিন্ন পর্যায়ে মেশানো হচ্ছে ভেজাল। শাকসবজিতে দেয়া হচ্ছে বিষাক্ত স্প্রে। সব ধরনের ফলমূল দ্রæত পাকিয়ে রঙিন বানাতে সর্বত্র কার্বাইড, ইথোফেন, আর পচন রোধে ফরমালিন প্রয়োগ করা হচ্ছে। মিষ্টিজাতীয় খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে বিষাক্ত রং, সোডা, স্যাকারিন ও মোম। শুধু ব্যক্তিস্বার্থের জন্য নানা কেমিক্যাল মিশিয়ে মাছকে বিষে পরিণত করা হচ্ছে। নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে এখন বাজার ছেয়ে গেছে যেটা সবার কাছে ওপেন সিক্রেট। মানুষ ক্রমাগত স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। যার প্রমাণ মেলে হাসপাতালের উপচে পড়া রোগী ও ফার্মেসিগুলোর দীর্ঘ লাইন। শুধু কি তাই, এদেশে শিশুদের বিকল্প খাদ্যসহ জীবন রক্ষাকারী খাবার স্যালাইনও নকল তৈরি করা হচ্ছে। ভেজাল খাবার দিয়ে আমরা জাতিকে ক্রমাগত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি। ভেজালের বহুমাত্রিক উপসর্গগুলো সর্বত্রই দৃশ্যমান হচ্ছে। কোথায় নেই ভেজাল? হাত বাড়িয়ে যা কিছু খাচ্ছি সবকিছুতেই ভেজাল। তাও আবার তৈরি হচ্ছে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। এজন্য অনেকেই মজা করে বলেন, মরতে যে চাই কিন্তু বিষেও ভেজাল আছে! পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতি বছর দেশে ৩ লাখ মানুষ ক্যান্সারে, ২ লাখ মানুষ কিডনি রোগে, দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া গর্ভবতী মা ১৫ লাখ বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মদান করেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, সারা দেশে ৫০ শতাংশ এবং ঢাকায় ৭০ শতাংশ খাদ্যদ্রব্যে ভেজালের মিশ্রণ রয়েছে। আমাদের শরীরের ৩৩ শতাংশ রোগের কারণ হলো এই ভেজাল খাদ্য। এমনকি করোনাভাইরাসে মৃত্যুঝুঁকির পিছনেও একটি অন্যতম কারণ হলো অনিরাপদ খাদ্য। কারণ এর মাধ্যমে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে ভাইরাস মানুষকে সহজেই কাবু করে ফেলছে। এ অবস্থার ধারাবাহিকতা থাকলে আগামীতে যে অসানিসংকেত আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। ভেজালকরণের এরূপ সর্বগ্রাসী প্রাদুর্ভাব মূলত সমাজের গভীর পচন প্রক্রিয়ার অভিপ্রকাশ। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত না হলে আমরা একসময় প্রতিবন্ধি জাতিতে পরিণত হব।

 

সকলেই অবগত, মৌসুমের আগে বাজারে যে ফলগুলো আসে সেগুলো অধিকাংশই কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো। এসব ফলমূলের নজরকাড়া রূপে আকৃষ্ট হয়ে মানুষ চড়া দামে ক্রয় করেন। অধিকাংশ ক্রেতারা সুন্দর রং না হলে কিনতে চান না। এভাবে আমরা অনিরাপদ বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি করছি। সুতরাং দেশের আপামর জনতা যতক্ষণ না স্ব স্ব অবস্থান থেকে সচেতন হচ্ছেন এ নীরব ঘাতক বন্ধ করা সম্ভব নয়। এই মনোভাব থেকে বের হতে না পারলে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা হবে। কারণ এসবের মাধ্যমে অজান্তেই আমাদের অনেকের শরীরে বাসা বাঁধছে নীরব ঘাতকরূপী কোন রোগ। এজন্য নির্ভেজাল সুষম খাবারের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু এদেশে অধিকাংশ মানুষের মাথাপিছু আয় কম হওয়ায় তারা ভাবেন যে সুষম খাবার পাওয়া হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু আমদের মনে রাখা উচিত যে সুষম খাদ্যের জন্য বেশি খরচ হয় না, প্রয়োজন একটু সচেতনতা যাতে কম দামেই প্রয়োজনীয় নিরাপদ খাবারের ব্যবস্থা করা যায়।
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেয়া এবং ভেজাল খাদ্য বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ১৪ বছরের কারাদন্ডেরও বিধান রয়েছে এ আইনে। কিন্তু আইনের যথার্থ প্রয়োগ খুবই কম দৃশ্যমান। ফলে প্রভাবশালীরা আইনের ফাক ফোকড় খুঁজে যেকোনভাবে ছাড় পেয়ে যায়। আর এসব ঘটনার সাথে জড়িত গডফাদার, প্রভাবশালী পুঁজিবাদী শ্রেণিসহ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ভেজালের জন্মদাতা ও লালনকারী শক্তি দিন দিন আরো সর্বগ্রাসী ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ভোক্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ভেজাল মেশাতে ব্যস্ত তারা। অনেকসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এদের নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেয়ে যায়। এমনকি র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালতের ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমেও এরূপ মানববিধ্বংসী কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে ভেজালবিরোধী অভিযান শক্তহাতে অব্যাহত রাখতে হবে। ভেজাল প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এর সাথে সম্পর্কিত প্রত্যেকটি মুনাফালোভীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে সমাজে ভেজালমুক্ত বাতাস প্রবাহিত হবে।

 

আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের স্বাস্থ্য, মেধা ও মননশীলতা কতখানি ব্যাহত হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ বিপুল জনগোষ্ঠিকে সুস্থ রাখার জন্য সরকারকে বিশুদ্ধ খাদ্য আইন বাস্তবায়নে দৃঢ পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাাপাশি বিএসটিআই’কে এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। খাদ্যমান মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য বাজারে নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান রাখতে হবে। যারা জনসাধারণকে মৃত্যুপানে ঠেলে দিচ্ছে; তাদের ভেজাল ওষুধ ও খাদ্যপণ্যের কারখানা একেবারে নির্মূল করতে হবে। নীতি নৈতিকতার চরম অধঃপতন সমাজে আজ বাসা বেঁধেছে। ক্রম প্রসারমান ভেজালের উৎপাত বন্ধ করা শুধুমাত্র কোন ম্যাজিস্ট্রেট বা সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের প্রয়াস দ্বারা সম্ভব হবে না। খাদ্য ভেজাল প্রতিরোধে সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। খাদ্যকে ভেজালমুক্ত করার দৃঢ় অঙ্গিকার নিতে হবে। নাগরিকরা সচেতন হলে ভেজাল প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

 

লেখক:
মো. আশিকুর রহমান
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়
মেইল: ধংযরশঁৎরঁ২২@মসধরষ.পড়স

 

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget
error: Content is protected !!