বাংলায় ইসলামি দাওয়াতের প্রাথমিক কাল

প্রকাশিত: ১০:১৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৫, ২০২০

বাংলায় ইসলামি দাওয়াতের প্রাথমিক কাল

জি. মোস্তফা:

আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে হযরত ইউসুফ আ. এর আমল থেকেই বাংলা-ভারতবর্ষের সঙ্গে আরবের যোগাযোগ ছিলো।আরব বণিকগণ বাংলার দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে এসে চন্দনকাঠ, হাতীর দাঁত, মসলা এবং সূতী কাপড় ক্রয় করতো এবং জাহাজ বোঝাই করে নিজ দেশে নিয়ে যেতো। আরবদের সামুদ্রিক বাণিজ্য প্রসার হওয়ার সাথে সাথে এ উপমহাদেশের উপকূল অঞ্চলে অবস্থিত প্রসিদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর আশে পাশে আরবদের স্থায়ী উপনিবেশ গড়ে উঠেছিলো। দক্ষিণ ভারতের মালাবার, কালিকট, চেরর এবং চট্টগ্রাম ও আরাকান উপকূলে আরব জনগণের এরূপ বসতি কয়েক শতাব্দি পূর্বেই গড়ে উঠেছিলো। আরবদেশ থেকে বছরে কমপক্ষে দু’বার এসব উপনিবেশ নৌবহর নোঙর করতো। ফলে ইসলামের আগমণের সাথে সাথেই তা এদেশের জনগণের কাছে পৌঁছেছিলো। কারণ ইসলামের আবির্ভাব তখন সমগ্র আরবে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। এরূপ সাড়া জাগানো খবর বণিকদের মাধ্যমে এ উপমহাদেশে পৌঁছেনি এমনটি ধারণা করা অসঙ্গত বলে মনে হয়। এ সময় রাসূল সা. এর আবির্ভাব এবং তাঁর প্রচারিত ধর্ম ইসলামের কথা লোকমুখে এক চমকপ্রদ খবর হিসেবে প্রচারিত হতো বলে অনুমেয় হয়। এর প্রমাণ স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে যে একদিন গুজরাটের রাজা ভোজ তাঁর প্রাসাদের ছাদে ওঠেন এবং চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত দেখতে পান। এ রহস্য উদঘাটনের জন্য তিনি ব্রাহ্মণদের ডেকে পাঠান। তারা যোগ সাধনা করে বললেন-আরবদেশে এক মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি তাঁর ধর্মের সত্যতা প্রমাণের জন্য আঙ্গুলের ইশারায় এ অলৌকিক ঘটনা দেখিয়েছেন। রাজা হযরত মুহাম্মদ সা. এর কাছে দূত পাঠালেন ও সাথে একখানি পত্র দিলেন। তাতে লিখেন, হে মহামান্য! আপনার এমন একজন প্রতিনিধি আমাদের দেশে পাঠান, যিনি আমাদের আপনার সত্য ধর্মের হেদায়াত দিতে পারেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ সা. তাঁর জনৈক সাহাবিকে ভারতবর্ষে পাঠিয়ে দেন। তিনি রাজা ভোজকে ইসলামের বাইয়াত করান। তাঁর নাম রাখেন ‘আব্দুল্লাহ’। রাজার ধর্ম পরিবর্তনে প্রজারা বিদ্রোহী হয়ে উঠে। তারা রাজার পরিবর্তে রাজার ভাইকে সিংহাসনে বসায়। যে সাহাবি এসেছিলেন তিনি এদেশেই ইন্তিকাল করেন। তাঁর ও ‘আব্দুল্লাহর (রাজা ভোজ) মাজার গুজরাটের দারদা শহরেই রয়েছে। তাফসিরে মাআরেফুল কুরআনেও রাজা ভোজের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

 

 

অপর এক বর্ণনায় রতন আল-হিন্দ নামে এক লোক মহানবি সা. এর সমীপে গিয়ে সাহাবি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন বলে জানা যায়। আরবে রাসূলুল্লাহ সা. এর ইসলাম প্রচারের কথা জানতে পেরে স্মরণদ্বীপের বাসিন্দারা রাসূলের সা. এর কাছে দূত পাঠান। এ দূত মদিনায় পৌঁছে হযরত ‘উমর রা. এর খিলাফত কালে। হযরত ‘উমর রা. এর সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তিনি কিছু কাল সেখানে অবস্থন করেন। তিনি ইসলাম ও ইসলামের নবি ও সাহাবিদের সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। দেশের ফেরার পথে ঐ দূত বেলুচিস্তানের কাছে মাকরান এলাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তার সাথী স্মরণদ্বীপের কাছে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। এতে স্মরণদ্বীপের জনগণের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়। স্মরণদ্বীপের রাজাও এ সময় ইসলাম গ্রহণ করেন বলে জানা যায়।

 

ড. মো. বেলাল হোসেন লিখেছেন,”রাসূলুল্লাহর (সা.) জীবদ্দশায় তাঁর কয়েকজন সাহাবী ভারতের মালাবার উপকূলে আগমন করেন। সেখানে তাঁরা চেরুমল ও পেরুমল নামক হিন্দু রাজার সাক্ষাৎ করেন। এ রাজা ইসলাম গ্রহণ করেন। রাজা শরীফ ইবনে মালিক নামক একজন আরবীয় মুসলিমকে ভূমি প্রদান করেন ও ইসলাম প্রচারের অনুমতি দেন। আরবীয় বণিকগণ সমগ্র মালাবার উপকূলে ও দাক্ষিণাত্যে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন। মালাবারের ইসলাম প্রচারকারী মুহাজিরগণ মোপলা নামে পরিচিত।”

 

 

ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, “চেরর রাজ্যের শেষ রাজা চেরুমল ইচ্ছাপূর্বক সিংহাসন ত্যাগ করে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করার অভিলাষে মক্কা নগরীতে গমন করে রাসূলের (সা.) সান্নিধ্যে হাজির হন। তাঁর নিকট ইসলামের বায়‘আত গ্রহণ করেন। মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার সময রাজা আল্লাহর নবীর জন্য আদা ও এদেশে তৈরি একটি তরবারীসহ কিছু মূল্যবান উপহার সামগ্রী সঙ্গে করে নেন। নবী করীম (সা.) সেই আদা নিজে খান এবং সাহাবীদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। সেই সময় থেকেই স্থানীয় মুসলিম ও অমুসলিমগণ এ ধারণা পোষণ করতো যে, রাজা কিছুকাল রাসূলের (সা.) সান্নিধ্যে অবস্থান করেন। পরে দেশে ফেরার পথে শহর নামক স্থানে ইন্তিকাল করেন।( তথ্যসূত্রঃ নন্দিত জাতি নিন্দিত গন্তব্যে পৃ.৩৩৮)

 

 

মহানবি সা. কর্তক (৬১০ খ্রি.) আরব ভূমিতে ইসলাম প্রচারের এক শতাব্দিকালের মধ্যে মুসলিমদের আধিপত্য আটলান্টিক মহাসাগর হতে ভারত সীমান্ত এবং কাস্পিয়ান সাগর হতে উত্তর আফ্রিকা (মিসর) পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। এতে সহজেই অনুমান করা যায়, পরবর্তীতে আরবের সাথে অপরার অঞ্চলের মতো ভারতের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। আরব নাবিক ও বণিকগণ সর্বদা মালাবার দিয়ে বঙ্গ প্রদেশ ও কামরূপ হয়ে চীন দেশে যাতায়াত করতেন। এ মালাবারই ছিলো তাদের মধ্য পথের প্রধান বন্দর। এখানকার মুহাজিরগণের ভাষাও ছিলো আরবি। সুতরাং হযরত মুহাম্মদ সা. ও ইসলাম ধর্মের সকল প্রকার বিবরণ সম্পর্কে তারা যথাসময়ে সম্যকরূপে অবগত হতে পেরেছিলেন, তা সহজেই বুঝতে পারা যায়। এ প্রসঙ্গে এটিও স্মরণযোগ্য যে, আরব বণিকরাই ছিলো হিজরি সপ্তম শতক পর্যন্ত এশিয়া ও আফ্রিকায় ইসলাম প্রচারের প্রধান উদ্যোগী। উক্ত বর্ণনার আলোকে বলা যায় যে, এ উৎসাহী ও ধর্মপ্রাণ প্রচারকগণের সংশ্রবে আসার ফলেই আমবারের আরব মুহাজিরগণ রাসূল সা. এর জীবনকাল খুব সম্ভবত হিজরি সনের প্রথমদিকেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সূচনা পর্বে বাংলায় ইসলামের আগমন এবং ইসলামি দাওয়াতকে দুটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে-

 

এক.সাহাবিগণের আগমন ও তাদের দাওয়াত প্রদান।

 

 

দুই. আরব বণিকদের আগমন ও দাওয়াত প্রদান।

এক.সাহাবিগণের আগমন ও তাদের দাওয়াত প্রদানঃ হিজরী দশ সাল ৯ ই যিলহজ্জ মাস। রাসূল সা. আরাফার ময়দানে প্রায় দুই লাখ সাহাবির বিশাল জনসমাবেশে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। নবিজির এই ভাষণ ছিল সর্বজনীন এক অনবদ্য ভাষণ। এই ভাষণের গতিধারা থেকে এটিই প্রতীয়মান হচ্ছিল, ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। ঠিক এ সময়ই আল-কুরআনের একটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। যার অর্থ হলো, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম।”

 

 

তিনি তাঁর এ বিদায়ী ভাষণে সাম্যবাদের এক মহান জয়গান ব্যক্ত করলেন। তিনি বলেছিলেন, “হে মানব জাতি! তোমাদের প্রভু এক ও অদ্বিতীয় এবং তোমাদের পিতা একজন। তোমরা জেনে রেখ আরবের উপর কোন অনারবের, কোন অনারবের উপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তেমনি শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের এবং কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের কোন মর্যাদা নেই। কেবলমাত্র আল্লাহভীতিই মর্যাদার মানদণ্ড। আজকের এই পবিত্র দিনে, পবিত্র মুহূর্তে তোমাদের সামনে মানবতার যে দিক নির্দেশনা পেশ করলাম তা তোমরা যারা উপস্থিত আছো, অনুপস্থিতদের নিকট পৌঁছে দিবে।

 

 

 

আজ থেকে মহাপ্রলয় পর্যন্ত ইসলাম মানবজাতির জন্য এক সর্বজনীন জীবন বিধান হিসেবে পরিগণিত হলো। বিদায় হজ্জে রাসূল সা.এর এ ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে মরণজয়ী সাহাবীগণ গোলার্ধের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিলো। পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসেবে ইসলামের সুমহান বাণী পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়াই ছিলো তাদের মহান দায়িত্ব ও কর্তব্য।

 

 

সমগ্র বিশ্বে সাহাবিগণের ছড়িয়ে পড়ার ধারাবাহিকতায় ভারতীয় উপমহাদেশেও তাদের আগমন ঘটেছিলো। উল্লেখ্য যে, পূর্বকাল থেকেই ভারতের সাথে আরবদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগাযোগ বিদ্যমান ছিলো।আরবরা নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বাংলায় আগমন করতো। যোগাযোগ ও পূর্ব সম্পর্কের কারণে রাসূল সা. ভারতীয় এলাকা থেকে অনেক সুগন্ধি উপহার হিসেবে লাভ করেছিলেন বলে জানা যায়। এমনকি জনৈক ভারতীয় রাজা রাসূল সা.কে কিছু আচার উপহার দিয়েছিলেন। ইমাম বুখারি বর্ণনা করেন যে, একবার হযরত আয়েশা রা.অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর চিকিৎসার জন্য ভারতীয় চিকিৎসকদের সাথে যোগাযোগ করা হয়। এ জন্য ‘হিন্দ’ শব্দটির অস্তিত্ব হাদিসে বিদ্যমান। রাসূল সা. বিভিন্ন সময়ে ‘হিন্দ’-এর কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর ওফাতের পূর্বে তিনি কোন এক সময়ে হিন্দুস্থানি শব্দ ব্যবহার করেছেন। কথিত আছে যে, হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ কোন একটি প্রতিনিধি দলসহ রাসূল সা. এর নিকট উপস্থিত হলে তিনি উপস্থিত লোকদেরকে শনাক্ত করার জন্য বলেছিলেন, আমার মনে হয় এরা হিন্দুস্থানি লোক। এতে প্রতীয়মান হয় যে, হিন্দুস্থান সম্পর্কে রাসূলের সা. ধারণা ছিলো।

 

 

ইসলামে তিনটি যুগকে শ্রেষ্ঠ যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। রাসূল সা. এ তিনটি যুগ সম্পর্কে বলেছেন, আমার যুগ হচ্ছে শ্রেষ্ঠ, অতঃপর পরবর্তী যুগ, এরপর তৎপরবর্তী যুগ। রাসূলের এ বাণীতে তিনটি শ্রেষ্ঠ যুগের কথা বলা হয়েছে। এক. রাসুলের যুগ, দুই. সাহাবি ও তাবিঈদের যুগ, তিন. তাবে-তাবিঈদের যুগ। সৌভাগ্যক্রমে এ যুগগুলোতেই বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে। রাসূল সা. এর মাক্কি জীবনে মক্কায় ইসলাম প্রচারিত হওয়ার অব্যবহিত পরেই প্রাচীন বাংলায় সাহাবিগণের আগমন ঘটেছিলো বলে অনুমান করা হয়। এ দেশে ইসলামের আগমনের প্রতি রাসূল সা. এর উৎসাহ কাজ করে। হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, রাসুল সা. আরবের পূর্ব দিগন্তে সুদূর চীন পর্যন্ত ইসলামের বাণী পৌঁছানোর জন্য ইচ্ছা পোষণ করতেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার পত্র প্রেরণের ঘটনা এ দাবির যৌক্তিকতা বহন করে।
ড.মো. বেলাল হোসেন লিখেছেন,”কখন বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ঘটেছিল তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা বড় কঠিন। তবে এতদসম্পর্কে ঐতিহাসিকগণের পরিবেশিত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করল দেখা যায় যে, হিজরী প্রথম শতকেই ভারতীয় উপমহাদেশে তথা মালাবারে ইসলামের আগমন ঘটে। তবে বাংলাদেশের উপকুলবর্তী এলাকা চট্টগ্রামে কখন ইসলামের আগমন ঘটেছিল তা সুনিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা খুবই দুরূহ হলেও খৃষ্টীয় অষ্টম অথবা নবম শতকে চট্টগ্রামের সাথে আরবের মুসলমান বণিকদের যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।” (বাংলাদেশে ইসলামী দাওয়াহঃ সূচনা পর্ব,সাপ্তাহিক সোনার বাংলা)

 

 

ঐতিহাসিক ড. আব্দুল করিম এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, -“খ্রিষ্টীয় অষ্টম অথবা নবম শতাব্দীতে চট্টগ্রামের সঙ্গে আরবীয় মুসলমান বণিকদের যোগাযোগ ছিল। পরবর্তীকালে চট্টগ্রামে আরব ব্যবসায়ীদের আনা-গোনার আরও প্রমাণ পাওয়া যায়। আরব বণিকরা চট্টগ্রামে স্বাধীন রাজ্য গঠন না করলেও আরবদের যোগাযোগের ফলে চট্টগ্রামের ভাষায় প্রচুর আরবী শব্দ ব্যবহৃত হয়। চট্টগ্রামী ভাষায় ক্রিয়াপদের পূর্বে “না” সূচক শব্দ ব্যবহারও আরবী ভাষার প্রভাবের ফল। অনেক চট্টগামী পরিবার আরব বংশোদ্ভূত বলে দাবি করে। চট্টগ্রামী লোকের মুখায়ব আরবদের অনুরূপ বলেও অনেকে মনে করেন। তাছাড়া চট্টগ্রামের কয়েকটি এলাকা যেমন, আলকরণ, সুলুকুবহর, বাকালিয়া ইত্যাদি এখনও আরবী নাম বহন করে।” এসকল বক্তব্য থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, চট্টগ্রাম দিয়েই সর্বপ্রথম বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে।

 

 

হিজরি তৃতীয় শতকের বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আবাদান আল মারওয়াযীর বর্ণনা মতে, হযরত আবি ওয়াক্কাস রা. ইসলাম প্রচারে বাংলায় এসেছিলেন।তিনি বঙ্গোপসাগরের তীরে অবতরণ করে নয় মাস বাংলায় ইসলাম প্রচার করেন।

 

 

এই সমুদ্র ভ্রমণের বিবরণ দিতে গিয়ে বাসার মঈন উদ্দীন তার “সাগর বিজয় ও আমেরিকা আবিষ্কারে মুসলমান” নামক গ্রন্থে লিখেছেন যে, “ইসলামের সুবহে-সাদিকের আলোকরশ্মি যখন মরু আরবের সমগ্র আকাশে পূর্ণভাবে বিকশিত হয়নি সেই আলোক আঁধারীর কুহেলী মুহূর্তেও মুসলমানরা সাগর মরু আর পাহাড় পর্বত অতিক্রম করে দিগন্তের পানে ছুটেছিল। সূর্যের আগে যেমন তার রশ্মি ছোটে, তেমনি দিক থেকে দিগন্তের পানে ছুটেছিল তারা। আর তাইতো দেখি পৃথিবীর আর এক প্রান্তে বিশ্বনবীর সাহাবী ও মাতুল ওয়াহাব (রা.) চীনের ক্যান্টন বন্দরে কর্মকান্ত দেহে শান্তির শয্যা গ্রহণ করেছেন। সাহাবী হযরত ওয়াক্কাস (রা.) ঠিক একই সময়ে মাহমুদ বন্দরে এবং সাহাবী তামীম আনসারী (রা.) মাদ্রাজের ১২ মাইল দক্ষিণে মেলাপুরে চিরনিদ্রায় নিরবচ্ছিন্ন অবসর গ্রহণ করেছেন। ঐসব অঞ্চলে তাঁদের মাজার আজও বিদ্যমান। কাজেই এটা সহজেই অনুমেয় যে, আবিসিনিয়ায় ইসলাম প্রচার করেই মুসলমানরা সেখানে তাদের গতিরুদ্ধ বা সীমায়িত করেনি। আবিসিনিয়ার পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে তারা পৌঁছেছিল। এবং এভাবেই তারা ভারত মহাসাগরের উত্তর উপকূল ও দক্ষিণাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিলেন।”

 

 

বাসার মঈন উদ্দীনের উপরোক্ত বর্ণনা থেকে রাসূলের মাক্কি জীবনেই পৃথিবীর পূর্ব দিগন্তে সাহাবিগণের আগমন নিশ্চিত বলে প্রমাণিত হয়। ঐতিহাসিকদের পরিবেশিত তথ্য থেকে আরো জানা যায় যে, প্রাচীন কালে চীনের ক্যান্টন বন্দরে যাবার পথে বঙ্গোপসাগরে উপকূলবর্তী এলাকায় আরবদের একটি যাত্রাবিরতি কেন্দ্র ছিলো। এটিকে কেউ কেউ চিটাগাং, সিলেট ও ক্রিদিং নামে উল্লেখ করেছেন। সম্ভবত সাহাবি আবিওয়াক্কাস ও তাঁর সঙ্গীগণ এই বন্দরে যাত্রাবিরতি করে এতদঞ্চলে ইসলাম প্রচারে ব্রতী হয়েছিলেন। তিনিই ছিলেন বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের পথিকৃৎ সাহাবি। তার পদাংক অনুসরণ করে উত্তরকালে আরো অনেক আরব মুসলমান ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এদেশে আগমন করে স্থায়ী নিবাস স্থাপন করেছিলেন। চট্টগ্রামের বঙ্গোপসাগরে উপকূলবর্তী এলাকায় তাদের আবাস ছিলো।

 

 

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. আব্দুল করিমের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, চট্টগ্রাম এলাকায় আরবরা যে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছিলেন এবং বাঙালি মেয়েদের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন তা এ অঞ্চলের কিছু কিছু লোকের চেহারা থেকে অনুমান করা যায়। দৈহিক গঠন, সৌষ্ঠব, রং, চেহারা প্রায়ই তাদের সাথে মিলে যায়। এছাড়া এ অঞ্চলে অনেক আরবি ভাষা বাংলা ভাষার সঙ্গে একীভূত হয়ে এখানে আরব মুসলমানদের অবস্থানকে সুনিশ্চিত করে।

 

দুই. আরব বণিকদের আগমন ও দাওয়াত প্রদান

আরব বণিকদের মাধ্যমে অনারব অঞ্চলে ইসলামের আগমন এবং ইসলাম প্রচার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে । পূর্বকাল থেকেই আরবরা ছিল ব্যবসা বাণিজ্যে পারদর্শী। আর এই ব্যবসা বাণিজ্যের সুবাদে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় অতি অল্প সময়ে ইসলামের এই সুমহান বাণী অর্ধগোলার্ধে ছড়িয়ে পড়ে। ইসলাম প্রচারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, একেকজন বণিক ইসলাম প্রচার ও প্রসারে এক একজন ধর্মপ্রচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলশ্রুতিতে প্রথম যুগেই ইসলামের সত্যবাণী পশ্চিমে মরক্কো, স্পেন, পর্তুগাল থেকে সুদুর চীন পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। পৃথিবীর কোনো কোনো অঞ্চলে মুসলিম বিজেতাগণের মাধ্যমে ইসলামের আলো পৌঁছলেও এ দুনিয়ায় এমন কয়েকটি দেশ আছে যেখানে কোনদিন মুসলিম বিজেতার আগমন ঘটেনি। অথচ সেখানে ইসলামের সত্যবাণী পৌঁছেছে । এর কারণ হল, ইসলাম প্রচারকদের একমাত্র নিঃস্বার্থ সত্য প্রচারের আকাঙ্ক্ষা এবং নিষ্কলুষ চরিত্র মাধুর্যই সে সব অঞ্চলে ইসলামের প্রচার ও প্রসার এবং একে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ পর্যায়ে পূর্ব ও দক্ষিণ ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, জাভা সুমাত্রা, বোর্ণিও তথা সমগ্র ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও মালদ্বীপের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বণিকরূপে আরব ধর্মপ্রচারকদের নিরলস প্রচেষ্টায় ইসলামের সুমহান বাণী বিকশিত হয়েছে এসব অঞ্চলে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে তাদের মাধ্যমে ইসলামের বাণী বিস্তৃতি লাভ করে।

 

 

বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ও প্রচারের দ্বিতীয় মাধ্যম হলো আরব বণিকরা। এদেশে আরব বণিকদের আগমনের পূর্বে আরব-বাংলা সম্পর্ক আলোচনা করা অনস্বীকার্য। কোখন আরবদের সাথে বাংলার সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিলো এ সম্পর্কে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকগণের বিরাট এক অংশ মনে করেন যে, হযরত ইসা আ.-এর পূর্বে বাংলার সাথে আরবদের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। প্রাচীন ইউনানি উৎসসমূহে এর প্রমাণ বিদ্যমান। যীশু খ্রিস্টের জন্মের পূর্ব থেকে আরবরা পালবাহী নৌকায় করে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষ ও বাংলায় জলপথে যাতায়াত করতো। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে চট্টগ্রাম বন্দর আরব বণিকদের নিকট বহুকাল থেকে পরিচিত ছিলো। তারা এ বন্দরে অবতরণ করে বাণিজ্যিক পণ্য সংগ্রহ করতো। এ বন্দর হয়ে তারা ব্যবসায় উদ্দেশ্যে স্থলপথ ধরে পূর্বদিকে তিব্বত ও চীনে গমন করতো। এ ছাড়াও তারা আরাকান ও বার্মায় সফর করতো। ড. এ রহীম বাংলার উপকূলবর্তী এলাকায় আরব বণিকদের আগমন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে এক পর্যায়ে উল্লেখ করেছেন করেছেন যে, ‘চাটগাঁয়ের সাথে আরবদের সম্পর্ক অতি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। এমনকি চাটগাঁ নামটি আসলে তাদের দেয়া নাম। গঙ্গার ব-দ্বীপ বা শেষ প্রান্তে এই স্থানটির অবস্থিতি বলে আরব বণিকরা এর নাম দেয় শাতিউল গাঙ্গ বা গঙ্গার উপকূল। তাথেকেই কালক্রমে চাটগাঁও বা চিটাগং এ রূপান্তরিত হয়েছে। চট্টগ্রামের সাথে অতি প্রাচীনকাল থেকে যে আরব বণিকদের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিলো, তার প্রমাণ স্বরূপ ড. আবদুল করিম স্বীয় ‘চট্টগ্রামে ইসলাম’ গ্রন্থে আরাকান রাজবংশীয় উপাখ্যান রাদজা তুয়ে বর্ণিত একটি উপাখ্যান উল্লেখ করেছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এ সময়ের শেষ ভাগে কান রাদজাগীর বংশধর মহত ইঙ্গত চন্দয়ত সিংহাসনে আরোহণ করেন। এ রাজা ২২ বছর রাজত্ব করার পর মারা যান। কথিত আছে, তার সময়ে (৭৮৮-৮১০ খ্রি.) কয়েকটি কুল অর্থাৎ বিদেশী জাহাজ রনবী (বর্তমানে রামরী) দ্বীপের সাথে সংঘর্ষে ভেঙে পড়ে এবং মুসলমান আরোহীদের আরাকানে পাঠানো হয়। সেখানকার গ্রাম-অঞ্চলে তারা বসবাস শুরু করে।

 

 

চট্টগ্রামের সাথে আরব বণিকদের সম্পদের প্রমাণস্বরূপ ঐতিহাসিকগণ আরো উল্লেখ করেন যে, কোনো এক সময় চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম-এর একটি বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে রামি বা রামু নামের একটি রাজ্যের অস্তিত্ব বিরাজমান ছিলো। সুলায়মান নামের জনৈক্য আরব বণিক বলেন যে, রামির রাজার পঞ্চাশ হাজার হাতি এবং পনেরো হাজার সৈন্য ছিল।

 

 

এসব ঐতিহাসিক তথ্য ইঙ্গিত বহন করে যে, জাযিরাতুর রামি নামে যে ভূ-খণ্ডের কথা ইতিহাসে বিবৃত হয়েছে তা ছিলো চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। আজকের কক্সবাজারের সমুদ্র সন্নিকটবর্তী রামু সেই রাজ্যরই একটি ক্ষুদ্রাংশ। চট্টগ্রামে আরব বণিকদের বেশি আনাগোনা ও বসতি স্থাপন এর ভিত্তিতে তৎকালীন সময়ে সেখানে তাদের দ্বারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের গোড়পত্তন হয়েছিলো কি না, সে সম্পর্কে অনেক মাতমত পাওয়া যায়। ড. এনামুল হক তার ‘আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য’ গ্রন্থে লিখেছেন যে, সে সময় চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরবীয় মুসলমানরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করেছিলেন বলে কোন কোন ঐতিহাসিক মনে করেন। কিন্তু ড. আবদুল করিম চট্টগ্রামে ইসলাম গ্রন্থে এ ধারণা সংশয়মুক্ত নয় বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। তবে এ কথা সত্য যে, খ্রিস্টীয় ১০ম শতকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুসলিম জনপদ গড়ে উঠেছিলো এবং এখানকার মুসলমানদের নেতা এমন শক্তিশালী হয়ে উঠে যে, আরাকানের রাজা তার বিরুদ্ধে সামারিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে এ কথা বলা যায় যে, সে সময় চট্টগ্রামে মুসলমানদের স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে না উঠলেও মুসলিম অধ্যুষিত একটি শক্তিশালী জনপদ গড়ে উঠেছিলো এতে কোন সন্দেহ নেই। প্রাচীন কাল থেকে আরবদের যোগাযোগের ফলে চট্টগ্রামের সংস্কৃতিতে তাদের গভীর প্রভাব লক্ষণীয়। চট্টগ্রামী ভাষায় প্রচুর আরবি শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত আরবি শব্দের তুলনায় এর সংখ্যা দ্বিগুণের অধিক বলা যেতে পারে। চট্টগ্রামের ভাষায় ক্রিয়া পদের পূর্বে না সূচক শব্দের ব্যবহার আরবি ভাষার প্রভাবের ফল। এ ছাড়া চট্টগ্রামী লোকদের মুখায়ব অনেকেই আরবদের অনুরূপ বলে মনে করেন। এখানকার অনেক পরিবার নিজেদেরকে আরব বংশোদ্ভূত বলে দাবি করে। চট্টগ্রামের কোনো কোনো এলাকা বা স্থান আজও আরবি নাম বহন করে চলেছে। এগুলো নাম আরবদের দেওয়া নাম। এসব তথ্য চট্টগ্রাম তথা বাংলা উপকূলীয় অঞ্চলের সাথে আরব বণিকদের প্রাচীনতম যোগাযোগের প্রমাণ বহন করে। আরবি ভাষা, আরবীয় সংস্কৃতি ও আরবীয় রক্তের মিশ্রণই এ এলাকায় ইসলামের ব্যপক বিস্তৃতির সহায়ক হয়েছে বলে মনে করা হয়। আরব বণিকরা এ অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্যের উপলক্ষ্যে ইসলাম প্রচারের ব্রতী হয়েছিলো। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং মহা অভিপ্রায়ে ইসলামের সত্যবাণী চট্টগ্রাম অঞ্চলে যেমন বিকশিত হয়েছিলো তেমনি সূচনা করেছিলো এক সোনালি দিগন্তের। ফলে উম্মোচিত হয়েছিল সকল আঁধারের। যে আঁধার ও অমানিশার বুক চিরে বিচ্ছুরণ ঘটেছিলো ইসলামের উজ্জ্বল প্রদীপ এবং অভ্যুদ্বয় ঘটেছিলো এক নয়া জ্ঞান প্রভার।

 

আরবদেশ এশিয়া ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এতদঞ্চলে ব্যবসা বাণিজ্যের চাবিকাঠি ছিল আরবদের হাতে। পূর্বকাল থেকে এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক অঞ্চল তাদের নিকট পরিচিত ছিলো। ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-ডা-গামা কর্তৃক আমেরিকা আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপের স্থল ও বাণিজ্যে আরব বণিকদের পূর্ণ আধিপত্য ছিল। কর্ডোভা থেকে শুরু করে চীন সাগরের উপকূল পর্যন্ত স্থল ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের সমস্ত কেন্দ্রস্থলে তাদের যাতায়াত ছিল। এসব অঞ্চলে তারা একদিকে যেমন ব্যবসা বাণিজ্য করতো অপরদিকে ইসলাম প্রচার করতো।

 

বাংলায় আরবদের ব্যবসা বাণিজ্যের যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ার কারণ উদঘাটনে ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন যে, এখানে পণ্য-সামগ্রীর দাম ছিলো খুবই-সস্তা। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা স্বীয় আজায়িবুল আসফার গ্রন্থে লিখেছেন যে, “বাংলা অত্যন্ত একটি বিস্তৃত একটি দেশ। এখানকার প্রধান উৎপন্ন দ্রব্য চাউল। এখানকার মত কম মূল্যে এতবেশি জিনিস বিক্রি হতো আমি আর কোন দেশে তা দেখিনি। এ দেশে এক রৌপ্য দিনারের বিনিময় পঁচিশ রতল তথা ৭.৫ মণ চাল পাওয়া যেত। দিল্লীর রতল এক পশ্চিমী রতলের সমান হয়ে থাকে। এখানকার দিরহাম আমাদের দেশের দিরহামের সমান, এতে কোন পার্থক্য নেই। আমার স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের সময় সে দেশের চালের উপরিউক্ত মূল্য ছিল, ঐ দেশের জনসাধারণের মতে যেটি ছিল সমধিক মূল্যবৃদ্ধির বছর। দিল্লীতে আমার বাড়ির কাছে বসবাসরত একজন দরবেশ আমাকে বলতেন যে, বাংলায় আমার, আমার স্ত্রীর এবং একদাসের জন্য আট দিরহামের খাদ্যসামগ্রী এক বছরের জন্য পর্যাপ্ত হয়ে যেত। সে সময় বাংলায় দিল্লীর মাপ অনুযায়ী আট দিরহামে পাইকারী বাজারে আশি রতল পরিমাণ ধান পাওয়া যেত।”

 

 

আরব বণিকরা বাংলা থেকে প্রধানত গরম মসলা, গজদন্ত ও নানাবিধ-মূল্যবান রত্ন সম্ভার ক্রয় করে ইউরোপের বাজারে রপ্তানী করতো। গরম মসলা উৎপন্ন হত সর›দ্ধীপ ও তার নিকটবর্তী ভারতে দক্ষিণ এলাকায়। কিন্তু হাতীর জন্য বাংলাদেশ প্রাচীনকাল থেকে বিখ্যাত ছিলো। আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণকালে বঙ্গরাজ্যের চার সহস্র সুসজ্জিত হস্তি সেনার কথা ইতিহাসে উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। ইবনে বতুতাও আরাকান এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে হাতী প্রাচুর্যের কথা উলেখ করেছেন। ষোড়শ শতকের ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে লিখেছেন যে, “বাঙ্গালার পূর্বে ও দক্ষিণ আরখংগ (আরাকান) নামে একটি বিরাট দেশ আছে। চাটগাঁও হচ্ছে তার সামুদ্রিক বন্দর এখানে প্রচুর হাতী পাওয়া যায়।” তাই সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় যে, আরব বণিকরা হাতীর দাঁত সংগ্রহ করার জন্য যে চট্টগ্রাম বন্দরে আসতো তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। হাতীর দাঁত এক মূল্যবান সম্পদ হিসেবে আরবদের কাছে বহুকাল ধরে সমাদৃত হয়ে আসছে। তাঁরা এ দাঁতগুলো দিয়ে মূল্যবান জিনিস তৈরি করতো এবং তা বিশ্ব বাণিজ্য বাজারে রপ্তানী করত।

 

 

হাতীর দাঁত ছাড়া আরব বণিকরা বাংলা তথা চট্টগ্রাম থেকে চন্দন কাঠ সংগ্রহ করতো। এই কাঠটি তাদের কাছে সুপরিচিত ছিলো। এ কাঠের গুণাগুণ হলো, এটি খুব সুগন্ধীযুক্ত কাঠ। এ থেকে আতরের মতো ঘ্রাণ বের হয়। পোড়ালে এর ছাই থেকেও সুগন্ধি বের হয়। ফলে এই মূল্যবান কাঠ সংগ্রহ করে তারা বিশ্ব বাজারে বেশি মূল্যে বিক্রি করত। এ ছাড়া তারা বাংলার সূক্ষ্মবস্ত্র মসলিন সংগ্রহ করতো। সমকালীন বিশ্বে এই সূক্ষ্মবস্ত্রের খ্যাতি ছিল। বাংলা ছাড়া অন্য কোন অঞ্চলে এরকম মূল্যবান কাপড় পাওয়া যেতো না। শুধুমাত্র এ মসলিন ঢাকায় তৈরি হয়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিদেশের বাজারে রফতানি হতো।

 

 

ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে পর্তুগিজ পর্যটক বার্থেমা ও বারবোসা বাংলা সফর করেন। তারা মেঘনা নদীর মোহনায় সন্দ্বীপের উত্তরে বেংগালা বন্দরে উপনীত হয়ে সেখানে বিরাট সংখ্যক মুসলিম সওদাগরকে কাপড়, চিনি ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয় করতে দেখেন। তাদের বর্ণনামতে, সেকালে সুতী কাপড়, চাল, চিনি, রেশমী কাপড়, আদা, মরিচ, মিরো, বোলান ইত্যাদী ছিল বাংলার রফতানি দ্রব্য। পর্যটক বার্থেমার ভ্রমণ বিবরণ থেকে জানা যায় যে, আরব বণিকরা বাংলা বন্দর থেকে প্রতিবছর ৫০টি জাহাজ সূতী কাপড়, রেশম ও রেশমী কাপড় বোঝায় করে নিয়ে সাগর পাড়ি দিতো। এ ছাড়া বাংলা থেকেই কাপড়, চিনি, আদা, মরিচ ইত্যাদি বোঝায় করে অনেকগুলো জাহাজ নিয়মিত মালয় দ্বীপপুঞ্জ, বার্মা সিংহল করোমন্ডেল উপকূল, আরব, পারস্য ও আবিসিনিয়ার পথে সাগর পাড়ি দিতো।

 

 

বাংলায় আগত আরব বণিকরা ব্যবসা বাণিজ্যের পাশাপাশি ইসলাম প্রচারে ও ব্রতী থাকতেন। তারা ব্যবসাকে শুধুমাত্রা উপলক্ষ্য করে মূলত ইসলামের সত্যবাণী প্রচারের জন্য এদেশে আগমন করেছিলেন। এর প্রমাণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, সে সময় বাংলাদেশে প্রসিদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র ছাড়া ও বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের আগমন ঘটেছিলো। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে, ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে পাল বংশের রাজত্ব শুরু হয়। আর এ সময়কাল ছিলো আব্বাসীয়দের খিলাফত। ধর্মপাল যখন বাংলাদেশের শাসক, তখন মুসলিম জাহানের খলিফা ছিলেন হারুনুর রশীদ। তারই খিলাফত কালে নওগাঁ জেলার অন্তর্গত পাহাড়পুরে কয়েকজন আরব বণিক আগমন করেছিলো। পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহার খনন কালে খলিফা হারুনুর রশীদের আমলের একটি স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া যায়। মুদ্রাটিতে ১৭২ হিজরি সন খোদিত ছিল বলে ড. মহর আলী উল্লেখ করেছেন। প্রাপ্ত এই মুদ্রাটি- পাহাড়পুরে তাদের আগমন সুনিশ্চিত করে। পাহাড়পুরে তাদের আগমনের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে জনাব আব্দুল মান্নান তালিব লিখেছেন যে, কেবলমাত্র ব্যবসা বাণিজ্য করাই মুসলিম বণিকদের লক্ষ্য ছিল না, এ সংগে তারা নিজেদের উপর অর্পিত ইসলাম প্রচারের দায়িত্বও পালন করে যেতেন। যে সত্যের আলোকে তাঁদের হৃদয়দেশ উদ্ভাসিত হয়েছে- অন্ধকারে নিমজ্জিত দুনিয়ার প্রতিটি মানুষকে সেই আলোকের সন্ধান দেয়া তারা নিজেদের ধর্মীয় ও মানবিক কর্তব্য বলে মনে করতেন। কাজেই এ বণিকদের মধ্য থেকে অতি উৎসাহী কেউ কেউ ধর্মালোচনা ও ধর্ম প্রচারার্থে তৎকালীন বাংলার শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় কেন্দ্র পাহাড়পুরের সোমপুর বিহার ও ময়নামতির শালবন বিহারে গিয়ে থাকবেন এবং তাঁদের কাছ থেকেই এই মুদ্রাগুলো সংশ্লিষ্ট বৌদ্ধ বিহারসমূহে আমদানি হয়েছিল বলে মনে করা যেতে পারে।

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget
error: Content is protected !!