শিশুদের দায়িত্বশীল করুন কাজের মাধ্যমে

প্রকাশিত: ৯:১৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০২০

শিশুদের দায়িত্বশীল করুন কাজের মাধ্যমে

আহাম্মদ ফয়সাল:

পৃথিবীর ভবিষৎ বর্তমান প্রজন্মের হাতে। বিশ্বকে সুন্দর ও শৃঙ্খল রাখতে হলে নিজেদের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি আগামীর ধারককেও দায়িত্ববান করে তোলতে হবে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু বলেছেন, ‘‘ শিশুরা হচ্ছে বাগানের কাদা মাটির ন্যায়। তাদের খুব সতর্ক ও আদর দিয়ে যত্ম করতে হবে’’। তারা প্রত্যেকে হল এক একটা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ফুলের ন্যায় এবং একসাথে মিলে এই দুনিয়াকে সুন্দর বাগিচা বানাতে পারে। প্রত্যেক শিশুরই রয়েছে আলাদা জগত। সে তার ভাবনা অনুযায়ী খেলতে চায়। তার চলাফেরা বন্ধুত্ব, খাবার ইচ্ছে ইত্যাদি কিছু গড়ে উঠে ভাবনার জগত অনুসারে। তার এই জগত বেড়ে উঠে পরিবার ও আপনজনকে দেখে। ইংরেজী একটি প্রবাদ আছে- একটি শিশুর পিছনে কাজ করে তার পরিবার। নৃবিজ্ঞানী মার্গারেট মিডের মতে ‘‘ শিশুদের শিক্ষা দেয়া উচিত যে তারা কীভাবে চিন্তা করবে, কী চিন্তা করবে সেটা নয়’’। শিশুদের দুরন্তপনার মাঝেই তাকে জানাতে হয় চিন্তার পরিসর, একটু একটু করে বোঝাতে হয় দায়দায়িত্ব। খেলাধুলা,পড়াশোনার বাহিরেও জীবনের প্রয়োজনে অনেক কর্তব্য রয়েছে। আর এসব শিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হলো পরিবার।

 

বাংলায় একটি প্রবাদ আছে- ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সকল শিশুর অন্তরে। একটি শিশু আগামীতে কী করবে তা নিয়ে আমরা কমবেশি সকলেই উদ্বিগ্ন, অথচ আমরা ভুলে যাই সে আজকেও কেউ একজন। বর্তমানের তারা হয়ত বুঝবে না তার কাজ কি; দ্বায়িত্ব কতটুকু। পরিবারই তাদের মেধা বিকাশের প্রধান ও প্রথম মাধ্যম। প্রতিনিয়ত কর্মকান্ডের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সে জানতে পারে জীবন সর্ম্পকে। জানতে জানতে একদিন সে বড় হয়ে উঠবে। তাই পূর্ণ দায়িত্বশীল ও সচেতন করে তোলার জন্য পরিবারের উচিত তার চিন্তার পরিসরকে সমৃদ্ধ করা।

 

শিশুর মানসিক বিকাশ ও দ্বায়িতশীল করে গড়ার জন্য প্রথমেই পরিবারকে জানতে হবে তার কী প্রয়োজন? কীভাবে তাকে আগ্রহী করে তুলতে হবে? বয়সের সাথে তাকে খাপ খাইয়ে চলার জন্য পাঠদান করতে হবে। কারণ বড়দের উপদেশ শোনার জন্য তারা মনযোগী না হলেও তাদের অনুসরণ করাতে খুব পছন্দ করে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ‘‘ শিশুরা হলো ভেজা মাটির মত, এর উপর যা কিছু পতিত হয় তার ছাপ ফুটে ওঠে’’। ভালে বিদ্যালয় তাকে হয়ত পেশায় সফল করে তুলবে কিন্তু একজন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা যারা তার কাছে অবস্থান করে তাদেও কাছ থেকে গ্রহন করে।

 

কোন কিছুই রাতারতি পরিবর্তন হয় না। ভালো কিছু পেতে হলে তা গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে। তেমনিভাবে শিশুদের পূর্ণ সচেতন নাগরিক হিসেবে একদিনেই গড়ে তোলা যাবে না। চারা গাছের ন্যায় প্রতিনিয়ত পরিচর্চার মত শিশুকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার মাধ্যমেই বেড়ে তুলতে পারলেই সম্ভব দ্বায়িত্বশীল নাগরিক ও সচেতন মানুষ হিসাবে বড় করা।
শিশুদের মন কৌতুহলতা পূর্ণ। তারা সর্বদাই জানতে প্রশ্ন করে থাকে। তাকে নতুন নতুন এক একটি বিষয়ে আলোচনা করে তাকে জানানো যেতে পারে নানান বিষয় সম্পর্কে। বন্ধু সুলভ আচরণ করে তার চলাফেরা ও খেলাধুলা থেকে কি শিখছে তার প্রতি লক্ষ্য রাখা। তার প্রতি লুকিয়ে দৃস্টি রাখা যাবে না, তাহলে তার মাঝে গোপন করার স্বাভব চলে আসবে। ছোট ছোট কাজ প্রদানের মাধ্যমে তাকে কাজের প্রতি উৎসাহ দেওয়া। শুধুমাত্র উপদেশ প্রদান না করে তাকে সাথে নিয়ে বয়স উপযোগী কাজ করা। শিশুরা ততটুকু বড় হয় যতটুকু আমরা তাদের বিশ^াস করি।

 

যেসব কাজ করানোর মাধ্যমে শিশুকে আগ্রহী করে তোল সম্ভব। যেমন- বই খাতা হাতে দিয়ে বলা স্কুল ব্যাগটি গোছানোর জন্য। বাহির থেকে এসে গাড়ির চাবি এমন স্থানে রাখা এবং তাকে বোঝানো এখানে রাখা হল যাতে বের হওয়ার সময় সহজে পাওয়া যায়। সে তখন নিজের জামা কাপড় ও স্কুল ব্যাগ সজিয়ে রাখতে শিখবে। আত্মীয় স্বজনের সাথে মোবাইলে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া। পানির গøাসে পানি ঢেলে পান করার শিখানো। বাসার টুকিটাকি বয়স উপযোগী কাজ দেওয়া, অতিথিদেও কেউ বাসায় এলে পরিচিত করানো। কুশলাদি বিনিময়ের অভ্যাস গড়ে তোলা। পোশাক পরিচ্ছদ পছন্দ করার স্বাধীনতা দেওয়া। বাসায় স্বল্প পরিসরে কোন খাবারের কিংবা নাস্তার আয়োজনে তার মতামত নেওয়া ও সাথে সাথে টেবিল সাজানোর কাজ দেওয়া যেতে পারে। কোথাও বেড়াতে বের যাওয়ার সময় তার জিনিসপত্র গোছাতে বলা। বিদ্যলয়ের যেকোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণে উৎসাহী করা এবং প্রস্তুত করে দেওয়া। খেলার সময় ও পড়ার সময়ের পার্থক্য বোঝান। কোন কাজ করার জন্য প্রথমেই আদেশ না করে, কাজটি করতে শিখানো অতঃপর করতে দেওয়া। কাজ করতে গেলে তার ফলাফলের দিকে না তাকিয়ে চেষ্টাকে গুরুত্ব দেওয়া। কাজ করার পর প্রশংসা করা, যদি ভুল করে ফেলে তাকে ভৎর্সণা না করে সুন্দও করে বুজিয়ে বলা। পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি মজার মজার বই পড়ানো। সেক্ষেত্রে ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারন করা। যেমন আজ দশ পৃষ্ঠা কাল পনেরো এভাবে বৃদ্ধি করা। শিশুদের গড়ে তোলার সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল তাদেরকে আনন্দ দেওয়া। আজকের দিনগুলো উৎসর্গ করি যেন তারা একটি সুন্দর আগামী পেতে পারে। ভালবাসা ও পরিচর্চায় সুস্থ, সুন্দর ও সাবলম্বীভাবে বেড়ে উঠুক জাতির আগামীর কর্ণধার বর্তমান শিশুরা।

 

লেখক

উপদেষ্টা, বাংলাদেশ তরূণ কলাম লেখক ফোরাম।

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget
error: Content is protected !!