আমরা কি শিখছি! কোন পথে হাঁটছি?

প্রকাশিত: ১:৩০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০২০

আমরা কি শিখছি! কোন পথে হাঁটছি?
আল আমিন ইসলাম নাসিম:
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘গাইতে গাইতে গায়েন, আর বায়তে বায়তে বায়েন’! অর্থ- মানুষের অনুশীলনের মাধ্যমেই সাধারণত শিখে থাকে বা প্রতিনিয়ত অভ্যাসের মাধ্যমেই শিখে থাকে। সুতরাং আমরাও প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজে যা কিছু ঘটছে, তা দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে আমরাও তাই শিখছি। বিশেষ করে আমাদের চারপাশে যে অসঙ্গতি হচ্ছে, সেগুলোর দেখতে দেখতে আমরা সেই অনুযায়ী অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি এবং যার বিরুপ প্রভাব আমাদের উপর প্রতিনিয়ত পড়ছে। তেমনি একই অসঙ্গতি হঠাৎ ফেসবুক নিউজফিড স্ক্রল করতে করতে ভেসে উঠে একদল তরুণের বানানো হাস্যরসান্তক প্রামাণ্য চিত্রে। সেই চিত্রে একজন রাজনৈতিক নেতার এবং সরকারি আমলাদের কাজের অংশগুলো তুলে ধরেছে এবং প্রসঙ্গটি ছিল দুর্নীতির বিষয়ে। দুর্নীতি বর্তমানে আমাদের দেশে জাতীয় একটি সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রায় সপ্তাহ না পেরোতে না পেরোতেই শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত পাঁচ বছরে দুর্নীতির অভিযোগে যত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে, তার অর্ধেকই সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারী। দুদকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তারা দুর্নীতির মামলায় ২০১৬ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭৯৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের মধ্যে ৩৯০ জনই​ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। দুদকের মামলায় গত পাঁচ বছরে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ৯৭ শতাংশের বেশি ছোট পদের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধি। এছাড়া জনপ্রতিনিধিদের মাঝে করোনার ক্রান্তিলগ্নে ২২৬৪ বস্তার ত্রাণের চাল চুরির অভিযোগই আছে (১০ এপ্রিল ২০২০, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন)। এছাড়া দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সূচকে বরাবরই বাংলাদেশ অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ।
২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দুর্নীতির শীর্ষ স্থানে থাকার পর কয়েক বছর ধরে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় ১৩ থেকে ১৭ নম্বরে ঘুরছে বাংলাদেশ। গত বছর ছিল ১৪তম। সুতরাং যে পরিমাণে দুর্নীতি দেশে ঘটছে তাতে এর বিরুপ প্রভাব সেই তরুণদের উপর ব্যাপক ভাবে পড়েছে। তরুণদের সেই দুর্নীতির প্রামাণ্য চিত্রটি ছিল মূলত জনপ্রতিনিধিদের প্রসঙ্গে। তারা সেই প্রামাণ্য চিত্রতে দেখিয়েছে কীভাবে সরকারের টাকা, রাস্তার উন্নয়নের নামে তারা হাতিয়ে নিচ্ছে। যেখানে রাস্তা নেই, সেখানকার জন্যও টাকা বরাদ্দ হচ্ছে, রাস্তা বারংবার খুড়াখুড়ি নিয়ে বারংবার টাকা আত্মসাৎ হচ্ছে এবং যারা রাস্তার সত্যতা যাচাই করতে আসছেন তারাও টাকা আত্মসাৎ করে রাস্তার বরাদ্দকে অনুমোদন দিচ্ছে। এতে প্রতিবছর যেমন ভোগান্তি রয়েই যাচ্ছে আবার সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মূলত প্রসঙ্গটি এটাই যে, আজকের আমাদের তরুণরা এইসব দুর্নীতির বিষয়ে হাস্যরসান্তক প্রামাণ্য চিত্র বানাবে কেন? তারা পড়াশোনা করবে এবং শিক্ষনীয় বা প্রযুক্তির উদ্ভাবন করবে বা উন্নয়নের প্রামাণ্য চিত্র তৈরি করবে, কিন্তু তা করলো না কেন? মূলত তারা বায়তে বায়তেই বায়েন হয়েছে। অর্থাৎ দুর্নীতি শুনতে শুনতে এবং দেখতেই এমন ভাবে তাদের মস্তিষ্কে টনক নড়ছে যে, দেশে দুর্নীতি চলছে এবং রাস্তা ভাঙ্গছে, জনপ্রতিনিধিরা এভাবে চারদিকে টাকার মহরা ছড়িয়ে অন্যায় কাজ করছেন এবং ধরা পড়ছেন। সুতরাং এ বিষয়ে প্রামাণ্য চিত্র তৈরি করি। অথচ তাদের এ বয়সে কি উচিত ছিল না, জনপ্রতিনিধি বা উন্নয়নের প্রামাণ্য চিত্র তৈরি করা? মূলত আমরা আশে পাশের যে অসঙ্গতি গুলো দেখি, তাই আমাদের প্রভাবিত করে যার ফলে আমাদের মনোভাব ও তৈরি হয় নেতিবাচক এবং মন্দ টিকেই বারংবার ফুটিয়ে তুলার চেষ্টা করি। এছাড়া এমনই এক বিরুপ প্রভাব দেখা যায়, ধর্ষণ মহামারীর মাঝে! মূলত ধর্ষণ মহামারী বলাই শ্রেয়। কেননা মহামারী কোভিড-১৯ যেমন করে বিস্তর ভয়াবহ তান্ডব চালাচ্ছে তেমনি দেশজুড়ে ধর্ষণ মহামারীর ন্যায় তান্ডব চালাচ্ছে বা সেই অনুযায়ী বৃদ্ধি পাচ্ছে ব্যাপক। এছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে জানা যায়, চলতি বছর ২০২০ সালে করোনাকালীন সময়ে গত ছয় মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬০১ জন নারী ও শিশু।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বিবৃতি অনুযায়ী, শুধু ২০২০ সালের অক্টোবর মাসেই সারাদেশে ২১৬ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এছাড়া স্টেট ওয়াচ ডট নেট অনলাইন জার্নাল থেকে জানা যায়, শুধু মাত্র গত অক্টোবর মাসে মাদ্রাসায় ৩৩ শিশু ধর্ষণ ও ৬৬ শিশু অমানবিক নির্যাতনের শিকার। কল্পনা করা যায়, কি এক দুঃসহ কাল চলছে! এই ধর্ষণ মহামারীর মাঝে, ‘এক ছোট্ট কন্যা শিশু তার শিক্ষককে জিজ্ঞেস করে উঠলো, স্যার ধর্ষণ কী? স্যার তখন নিজের বোবা চাপা কষ্ট, ক্ষোভ চাপিয়ে রেখে বলেন : আমি আগামীকাল বলবো, এখন পড়তে বসো’!(সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের টিউটর গ্রুপ থেকে সংগৃহীত) তাহলেই আমরা অতি সহজেই বোধগম্য হচ্ছি আমরা আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র থেকে মূলত কি শিখছি এবং কোন পথে যাচ্ছি আমরা? এছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের শৈশব থেকেই রয়েছে ত্রুটি। শিক্ষা ব্যবস্থায় নেই কোনো মহাপরিকল্পনা। আমাদের শিক্ষার্থীরা, এখনও পরীক্ষার হলে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে লেখে এবং আমরা তাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে পারিনি। সেই দেখাদেখি লেখা তারা শৈশব থেকে শিখে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ব্যবহার করছে। ফলপ্রসূ কী হচ্ছে? তারা বেকার থেকে যাচ্ছে এবং ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে থাকছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৭৭ হাজার। এর মধ্যে শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত ২৩ লাখ ৭৭ হাজার। কল্পনা করা যায়?
কিছুদিন আগে বিআরবি ক্যাবলসের চেয়ারম্যান তার এক ইন্টারভিউতে বলছেন, আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত ছেলেমেয়েরা গ্রাজুয়েশন শেষ করছে কিন্তু চাকরি পাচ্ছে না, মূলত কেন? কারণ আমাদের যা প্রয়োজন, আমরা তাদের কাছে তা পাচ্ছি না। আবার তাদের যা বিষয়সমূহ অনুযায়ী পড়াশোনা, তাদের সেই তালিকায় বাজারে চাকরি নেই, আবার পড়াশোনার পাশাপাশি যে, ব্যবহারিক শিক্ষা তা নেই! যার ফলশ্রুতিতে আমাদের দেশে লাখো বেকার তৈরি হচ্ছে। আবার বিদেশে যেয়েও কাজ করার মতো আমরা দক্ষ হয়ে উঠতে পারছি না। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে‌ই উঠে‌ই শুরু হয়ে যায় সিনিয়রদের র্যাগিং করা এবং মানসিক ভাবে হেনস্থা করা। সেই ক্ষোভে ফেটে ফুঁসে তারা আবার তাদের জুনিয়রদের র্যাগিং করে। এভাবে পর্যায়নুক্রমে চলতেই থাকে। অনেকে আবার মানসিক চাপের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে আসে, পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের চরম একটি‌ ছাত্র নির্যাতনের ঘটনা দেখা যায় বুয়েটে আবরার ফাহাদকে নৃশংস ভাবে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনায়। প্রথম আলো থেকে জানা যায়, যে সকল ছাত্ররা আবরার ফাহাদকে হত্যা করেছে বা নির্যাতন করেছে তারা আদালতে জবানবন্দি দেন যে, তারা তাদের সিনিয়র কাছ থেকেই এমন শিখে আসছে(অর্থাৎ নির্যাতন, সহিংসতা, র্যাগিং ইত্যাদি)। সুতরাং নিঃসন্দেহে বোধগম্য হ‌ওয়া যাচ্ছে আমরা আসলে কি শিখছি এবং কোন পথে হাঁটছি?
এছাড়া উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় দেখা যায়, আমাদের সমাজে, আমরা যদি সবসময় বাড়িতে হৈচৈ করি বা খারাপ আচরণ করি, সেগুলো আমাদের সন্তানদের মাঝে বিরাজ পায়। অর্থাৎ আমরা যা করছি, তাই দেখাদেখি আমাদের শিশুরা শিখে থাকে। সুতরাং অনেক সময় দেখা যায়, আমরা আমাদের সমাজের বা প্রতিবেশিদের সঙ্গে ঠিক মতো আচরণ করি না বা কথাই বলি না। পাশাপাশি আমাদের সন্তারাও তাই শিখছে। অথচ নবম এবং দশম শ্রেণীর ইংরেজি ব‌ইয়ের অনুচ্ছেদ আছে, সমাজে মিলেমিশে থাকার গুরুত্ব সম্পর্কে। আমাদের সন্তানরা ব‌ই পড়ে শিখছে কিন্তু ব্যবহারিক ভাবে শিখছে না। ফলপ্রসূ বিপদে আপদে কাউকে পাশেও পাচ্ছে না। এছাড়া ড. শহীদুল্লাহর মতে, আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন, ব‌ই, ব‌ই এবং ব‌ই। কিন্তু আজকাল আমরা ব‌ই থেকে দূরে সরে আসছি এবং হাতে মুঠো ফোন নিয়ে বাসে, ট্রেনে এবং চায়ের দোকানে বসে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছি, শুধুমাত্র গেমস খেলে এবং ফেসবুক চালিয়ে। অথচ উন্নত বিশ্বে দেখা যায়, তরুণেরা যেখানেই ভ্রমণে যাক, কিংবা বাসে বা চায়ের দোকানে সব খানেই তাদের হাতে ব‌ই থাকে। অথচ আমরা কি শিখছি? যেখানেই যাচ্ছি, সেখানেই কিশোর, যুবদের হাতে ফোন নতুবা ধূম্র শলাকা দেখছি! তদাপুরি আমাদের এই বিষয়গুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
এছাড়া আরও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমরা আমাদের আত্মীয় স্বজনদের পূর্বের মতো আপ্যায়ণ করি না। যার ফলে আমাদের বাড়ির সন্তানরাও তাই শিখছে। পাশাপাশি আমরা একক পরিবারের দিকে ধাবিত হচ্ছি। যৌথ পরিবারের ভেঙ্গে শহুরে মুখে হচ্ছি। আমাদের পিতা মাতাদের বৃদ্ধাশ্রমে দিচ্ছি অথবা গ্রামে ফেলে রেখে দূরে পাড়ি জমাচ্ছি। তাদেরকে বঞ্চিত করছি নাতি নাতনিদের আদর করা থেকে। আবার শিশুরাও বঞ্চিত হচ্ছে দাদার ভালবাসা থেকে। পাশাপাশি তারা এটাও শিখছে বৃদ্ধ বাবাকে কীভাবে ফেলে আসতে হয় এবং কীভাবে একাকী বসবাস করতে হয়? তারাও সেই সেগুলো দেখে দেখে শিখছে! তথাপি সমাজে প্রতিনিয়ত নানা নেতিবাচক বিষয়াবলী ঘটছে, যেগুলো দেখতে দেখতে এবং শিখতে শিখতে আমাদের সমাজের ছোট্ট ছেলে মেয়েরা সেই পথে হাঁটছে, সেগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছে। ফলে তার মধ্যে ইতিবাচক কিছুর সম্প্রসারণ ঘটছে না। যা সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য আগামীতে ভয়াবহ কিছু ডেকে আনতে পারে। মূলত বিষয়টি একেবারেই হেলাফেলার করার বিষয় নয়। বর্তমানে আমরা কি শিখছি এবং কোন পথে হাঁটছি তা এখন থেকেই পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র বিবেচনা না করলে, ভবিষ্যতে এর ফল ভয়াবহ রুপ ধারণ করতে পারে। সুতরাং এ বিষয়ে সকলকে সচেতন হওয়া আবশ্যক। তথাপি নেতিবাচক মনোভাব আমাদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটাতে সদা তৎপর এবং ইতিবাচক মনোভাব আমাদের সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে বড্ড পরিকর।
শিক্ষার্থী
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget
error: Content is protected !!