ভ্রাতৃত্বের বন্ধন

প্রকাশিত: ১:৫৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০২০

ভ্রাতৃত্বের বন্ধন
মোঃআব্দুর রাজ্জাক:
একদা নিতান্ত এক গরিব পরিবারের এক গরিব ছেলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করত।তার স্বপ্ন ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত হওয়ার।তিনি যখন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন,তখন তার বাবা মারা যান।
অত্যন্ত বেদনাহত হয়ে পড়েন।ছয় ভাই-বোন এর সংসারে তিনি ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ। মা তখন বয়সে অশীতিপর না, তবে রোগা ছিল খুব। তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন।আর্থিকভাবে স্চ্ছল সেরকম নিকটআত্মীয়ও ছিল না।ছোট ভাই-বোনের কথা চিন্তা করে পরিবারের তাগিদে শিক্ষা জীবনের ইতি টানেন।শুরু করেন উপার্জন করা।
শুরুতে দিনমজুর হিসেবে নিজ অঞ্চলে কাজ করেন,তাতে যা উপার্জিত হত,তা পরিবারের জন্য যথেষ্ট ছিল না।ছোট ভাই-বোনরাও তখন ক্লাস ওয়ান,থ্রি,সেভেন ও বোনদ্বয় হাফীজী পড়ত।নিজে তখন ক্লাস নাইনে অধ্যয়নরত ছিলেন।শপথ নিলেন নিজে না পারলেও ভাই-বোনদের পড়াশুনা চালিয়ে যাবার,যত কষ্টই হোক।কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন।
একটা সময় বোনদ্বয়ের বিয়ে হয়ে যায়।কিছুটা হলে দায়িত্ব হ্রাস পায়।এবার শুধু ভাইদের নিয়ে ভাবতে থাকেন।ভাইদের ছোট বেলায় মিতব্যয়ী হতে শিখিয়েছিলেন।বাবা মৃত্যু হওয়ার সাত বছর পর মাও মারা যান।
পরিবারের কথা চিন্তা করে খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করেন।ভাইরা বেশ কৃতিত্বের সাথে লেখাপড়া শেষ করেন।তার সম বয়সী ভাই তখন ব্যাংকে জব পেয়ে যান।কিছু দিন পর সে ভাইও বিয়ে করেন।ক্রমান্বয়ে অন্য ভাইরাও বিভিন্ন জব শুরু করেন।তারাও বিয়ে করেন।কিন্তু সবাই গরিব পরিবারে বিয়ে করেন।যেটা বড় ভাইয়ের আদেশ ছিল।ভাইরা সব সময় বেশ অনুগত ছিল বড় ভাইয়ের প্রতি।
প্রতিমাসে বেশ কিছু টাকা পয়সা দিত।সেটা কিছুতেই তাদের স্ত্রীরা নিতে পারতো না।তাছাড়া তাদের স্ত্রীরা নিজেদের ভেতরে প্রায়ই ছোটখাট বিষয় নিয়েই বিবাদে জড়িয়ে পড়ত।প্রতিদিন রাতে বাসায় ফেরার পর শুরু হত, নানা অভিযোগ,বাড়িটা হয়ে যেত আদালত!কিছুতেই তাদের বোঝানো যেত না।
এবার অন্য ভাইরা সবে মিলে গোপনে একটা সিদান্ত নিলো।তাদের স্ত্রীদের উচিত শিক্ষা দেয়ার।সেমতে তারা সবাই অনেক দূরবর্তী কোন কোন জেলায় বদলি হলেন।কিন্ত স্ত্রীদের কাছে সেসব স্থানের কথা বলেনি শত আপত্তি সত্ত্বেও।বড় ভাইকে যাবার আগে গোপনে তাদের সিদান্ত জানিয়ে যান।মাস শেষে তিন ভাই বেশ ভালো অঙ্কের টাকা বড় ভাইর কাছে পাঠাত।স্ত্রীরা মাস শেষে টাকা চেয়েও স্বামীদের কাছে না পেয়ে সবে বড় দেবরের কাছে গিয়ে তার ভাইদের টাকা না পাঠানোর কথা বলে চেঁচামিচি শুরু করেন।
বড়ভাই তাদের বুঝিয়ে বলেন,তোমরা শান্ত হও ঠিক হয়ে যাবে।তিনি সবাইকে যার যার চাহিদায়ানুযায়ী টাকা দেন।অবশ্য সব টাকাই আসত ভাইদের কাছ থেকে।প্রায় তিন মাস পর ঈদের ছুটিতে ভাইরা বাড়ি ফিরেন।সব ভাইরা এসে বড় ভাইয়ের বাড়িতে উঠে।বড় ভাইর বাড়িই  সবাই খাওয়া-দাওয়া করেন।বেশ ভালোই খাবার-দাবারের আয়োজন হত।চার ভাই বেশ হাসিখুশি থাকত।
স্ত্রীরা ভাবছিল প্রায় তিন মাস পর বাড়িতে আসছে,এমনেতেই বাড়ি আসবে।আমরা নিজেরা অনুতপ্ত হয়ে স্বামীর কাছে কেউ যাব না।এহেন এমন মতলব কিছুতেই কাজে আসছিল না।তাছাড়া পাড়ার আব্দুল কুদ্দুস ফকিরের বউ যে উৎপাত শুরু করছে, সে নাকি মেয়ে দেখা শুরু করছে তাদের জন্য!
এবার তিন ভাই মিলে বড় ভাইয়ের পরিবারের জন্য ঈদের পোশাক নিয়ে আসল।সে কি দুঃখ!দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ল তাদের স্ত্রীরা।কাকে এত ভালোবাসলাম!সে একবার বাড়িতেও আসে না।সে কি অভিমান স্ত্রীদের!যেন ট্রয় নগরী বিধ্বস্ত ভালোবাসায়!যথারীতি তারা নিজেদের ভেতরে ঝগড়া-বিবাদ ভুলেই গেল প্রায়।এবার স্ত্রীরা নিজেরা এক জাগায় বসে বলতে লাগল।আমরা পর, আমরা তো আর তাদের রক্ত না।তো আমরা নিজেরা ঝগড়া-বিবাদ করে কোনো লাভ নেই।বরং নিজেরা আরও কষ্ট পাচ্ছি।
এদিকে ঈদের দিনও খুব নিকটে।স্ত্রীরা মিলে সবাই রাতে গিয়ে বড় ভাইয়ের বাড়িতে যার যার স্বামীর কাছে মাফ চেয়ে ভুল স্বীকার করল।অবশেষে স্ত্রীরা অনন্য রমণীয় হয়ে উঠল।একত্রিত হলো সব ভাইদের পরিবার।এ দৃশ্য দেখে সে রাতের চাদঁ খুশির লজ্জায় বারবার মুখটা সাদা মেঘে ঠেকেছিল।
তারাগুলি চাদেঁর খুশির নিমন্ত্রণে বড্ড শিহরিত হয়ে  চমকাতছিল।সে রাতে মুকুটহীন সম্রাট হয়েছিলেন বড় ভাই।তার শ্রমের প্রত্যেকটা দীর্ঘশ্বাস সার্থক হয়েছিল।বড় ভাইয়ের চোখ দু’টো আনন্দে পাওয়ার সুখে অশ্রুসিক্ত হয়েছিল।
লেখক
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget
error: Content is protected !!