প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও বাংলায় ইসলাম প্রচার

প্রকাশিত: ১২:৩৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০২০

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও বাংলায় ইসলাম প্রচার

 

জি.মোস্তফা

বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, আরব ভৌগোলিকদের বিবরণ, আরব বণিকদের রচনা, প্রচলিত কিংবদন্তি ও লোকগাঁথা প্রমাণ করে যে, তুর্কিদের আগমনের আগে থেকে এদেশের সাথে মুসলমানদের যোগাযোগ ছিলো।

 

১. সাহাবিদের আগমন ও মসজিদ নির্মাণঃ
৬১০ খ্রিস্টাব্দে মহানবি হযরত মুহম্মদ সা. নবুওয়াতপ্রাপ্ত হন। এরপর তিনি আরব দেশে ইসলাম প্রচার করতে থাকেন। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি মক্কা থেকে মদিনায় হিযরত করেন। মদিনায় হিযরতের পর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইসলাম প্রসিদ্ধি লাভ করতে থাকে। এর ফলে সাহাবিদের মাধ্যমে এদেশে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটে। হিজরির প্রথম দশকেই হযরত ওমর ফারুক রা. এর সময়ে মহানবি সা. এর দুই সাহাবি হযরত মামুন রা: ও হযরত মুহায়মিন রা: বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আসেন বলে জানা যায়। আবার অন্য সূত্রে জানা যায়, মহানবী সা. সাহাবি আবি ওয়াক্কাস রা. প্রথম সাহাবি যিনি বাংলায় ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আসেন। আল্লামা সাঈদী লিখেছেন,” নবী করীম (সা:) নবুওয়াত লাভ করার পাঁচ বছর সময়কালে সাহাবায়ে কেরাম হাবশায় হিজরত করেছিলেন। নবুওয়াত লাভের সাত বছর সময়কালে হযরত আবু ওয়াক্কাস (রা:) বাদশাহ নাজ্জাশীর দেয়া সমুদ্রগামী জাহাজ নিয়ে দিক দিগন্তে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর লক্ষ্যে বের হয়েছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন হযরত আবু কায়েস ইবনে হারেছা (রা:), হযরত ওরওয়াহ ইবনে আছাছা (রা:) ও হযরত আবু কায়স ইবনে হারেছা (রা:)।”( নন্দিত জাতি নিন্দিত গন্তব্যে, পৃ. ৩৩৬)। হযরত আবিওয়াক্কাস রা. তাদের সঙ্গে নিয়ে আর মক্কা মদিনায় ফিরে যাননি। তারা ভারতের বিভিন্ন বন্দরে অবতরণ করে ইসলামের দাওয়াত দেন।বাংলাদেশেও তারা এসেছিলেন। শেষে চীনে গিয়ে পৌঁছেন অতঃপর সেখানেই ইন্তেকাল করেন। চীনে এখনো তাঁর সমাধি রয়েছে।
অন্য এক বিবরণ থেকে জানা যায়,৭ম ও ৮ম শতাব্দিতে আরব দেশ থেকে বাংলায় হামেদ-উদ-দীন, হোসেন-উদ-দীন, মুহাম্মদ মোর্তজা, মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ও মুহাম্মদ আবু তালিব- এই পাঁচজন সাহাবি ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলায় আসেন।

 

বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে ৬৯ হিজরিতে নির্মিত মসজিদ আবিষ্কৃত হয়েছে। এই মসজিদের শিলালিপিতে লেখা রয়েছে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। তখন উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিকের খিলাফত ছিলো। এই মসজিদটি নির্মাণ করেন মহানবী সা: এর সাহাবি আবু ওয়াক্কাস রা: ৬৯ হিজরিতে অর্থাৎ ৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে। তিনি সমুদ্রপথে প্রথম বাংলাদেশের লালমনিরহাটে ইসলাম প্রচার করতে আসেন। কাজেই বলা যায় ইসলামের প্রাথমিক যুগে বাংলায় ইসলামের প্রসার ঘটে সাহাবিদের মাধ্যমে।

 

২. প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনঃ
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সাহায্যে আমরা দেখবো যে, তুর্কী অভিযানের আগে বাংলায় মুসলমানদের আগমন ঘটেছিলো কিনা।

 

ক. পাহাড়পুর: পাহাড়পুরের প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে আব্বাসীয় আমলের মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। মুদ্রাটি আব্বাসীয় খলিফা হারুন-অর-রশীদের শাসনামলে (৭৮৬-৮০৯) আল মুহাম্মাদীয়া টাকশালে নির্মিত। বাংলার পাল আমলের বৌদ্ধ রাজা ধর্মপালের শাসনামলে মুদ্রাটি এখানে আসে। মুদ্রাটি কিভাবে এখানে আসে তা নিয়ে মতভেদ আছে ঐতিহাসিকদের মধ্যে। ড. মুহম্মদ এনামুল হক মনে করেন, কোনো সূফি ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এই মুদ্রাটি এখানে নিয়ে আসেন এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুর হাতে প্রাণ হারান। বৌদ্ধ ভিক্ষু মুদ্রাটি রেখে দেন। সূফিদের মাধ্যমে হোক আর ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে হোক মুদ্রাটি খ্রিস্টিয় ৮ম ও ৯ম শতাব্দিতে বাংলার সাথে মুসলমানদের যোগাযোগের অকাট্য প্রমাণ।

 

খ. ময়নামতি: কুমিল্লার ময়নামতিতে খননের সময়ে দুইটি আব্বাসীয় মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। আরবিতে মুদ্রা .দুটির একটি সোনার আর একটি রূপার। স্বর্ণমুদ্রাটি আব্বাসীয় খলিফা মুসতামিম বিল্লাহ (১২৪২-১২৫৮) কতৃক মুদ্রিত। রৌপ্য মুদ্রাটি পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। যাই হোক, এর থেকেও বোঝা যায় যে, আরবদের সাথে এদেশের সম্পর্ক ছিলো।

 

৩. ভৌগোলিক তথ্যাবলিঃ
তুর্কি আক্রমণের আগে এদেশে মুসলিমদের আসার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় বিভিন্ন আরব বণিকদের বিবরণে। প্রাক-মুসলিম বাংলাদেশের সাথে আরবদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিলো তার প্রমাণ পাওয়া যায় সুলায়মান, ইদরিসি, মাসুদী,আল বিরুনি,ইবনে বতুতা প্রভৃতি বিভিন্ন আরব ভূগোলবিদদের লেখা ইতিহাস ও সফরনামায়।

 

এছাড়াও আরো অনেক তথ্যসূত্রে প্রমাণিত হয় যে বাংলার সঙ্গে প্রাচীনকাল থেকে আরবদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। অনেক পূর্ব থেকেই এদেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের কাজ চলেছে।

 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ।

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget
error: Content is protected !!