গোলাপ দেয়া হলো তবুও প্রেম হলো না

প্রকাশিত: ৫:০৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২০

গোলাপ দেয়া হলো তবুও প্রেম হলো না

জুবায়ের আহমেদ

আজ থেকে ১৫ বছর আগেও গ্রামাঞ্চলের রাস্তা ঘাটের উন্নতি হয়নি তেমন। আর ২০ বছর আগে শহরের সাথে যোগাযোগের রাস্তা ব্যতীত সকল রাস্তাই ছিলো কাচা মাটির। রিক্সা চলাচলও ছিলো না বহু রাস্তায়। ফলে দূর দূরান্তে ফসলি জমির উপর দিয়ে হেঁটে যেতো হতো আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে বেড়াতে।

আজ থেকে ২১ বছর আগের কথা হাসানের বড় বোন বিয়ে দিয়েছে কয়েক ক্রোশ দূরের রহমতপুরে। বর্ষা কালে নৌকা ও সুদীনে পায়ে হেঁটে যেতে হয় সেখানে। একমাত্র ছোট ভাই হিসেবে বিয়ের পর বোনকে আনতে যাওয়া ও দেখতে যাওয়ার জন্য হাসানকেই যেতে হয় সব সময়।

কলেজ পড়ুয়া হাসান বন্ধুদের আড্ডায় মেতে থাকে সব সময়, তখনকার সময় গ্রামাঞ্চলে মোবাইলের প্রচলন শুরু না হওয়ায় আত্মীয় স্বজনের খোঁজ নিতে হলে সরাসরি গমন কিংবা আশে পাশে থাকা অন্য আত্মীয়ের মাধ্যমেই খোঁজ নিতে হতো।

হাসানের বোন শারমিন কেমন আছে দেখে আসার জন্য হাসানকে পাঠায় মা জামিলা বেগম। হাসান একাই বোনের বাড়ীতে যাওয়ার জন্য সকাল সকাল রওয়ানা হয়। চৈত্রের খরতাপে হেঁটে হেঁটে কাহিল হাসান পথিমধ্যে রাস্তার পাশের এক বাড়ীতে উঠে এক গ্লাস পানি খেতে চায়। বাড়ীর বয়স্কা মহিলা, সালমা নামে এক মেয়েকে ডাক দেয়। সালমা, এদিকে আয় তো, গ্লাস দিয়া পানি দে পোলাডারে।

ফর্সা, লম্বা একটি মেয়ে, হাসানদের বয়সীই হবে গ্লাসে পানি নিয়ে হাসানের সামনে এসে হাতে গ্লাস দেয়, সালমাকে দেখে মুগ্ধ হয় হাসান। মুহুর্তের মধ্যেই পানি খাওয়ার কথা ভুলে সালমার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে হাসান। লজ্জা পায় সালমা। হাল্কা কাশি দিয়ে বলে,ভাইয়া আপনার হাতে পানির গ্লাস, পড়ে যাবে কিন্তু।

সালমার কথায় হুশ ফিরে হাসানের। সাথে সাথে মাটিতে বসে পানি পান করে গ্লাস সালমার হাতে দিয়ে সালমাকে ধন্যবাদ দিয়ে বোনের বাড়ীর পথে রওয়ানা হয় হাসান।

বোনের গ্রামের বাজার থেকে মিষ্টি নিয়ে বোনের বাড়ীতে হাজির হয় হাসান। আলাপচারিতা শেষে খাওয়াদাওয়া করে রেস্ট করতে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় হাসান। আর ভাবতে থাকে সালমার কথা। স্কুল ও কলেজ জীবনের শুরুতে অনেক সুন্দরী মেয়ে দেখলেও এক দেখাতেই সামলার মতো আর কাউকে ভালো লাগেনি হাসানের।

বোনের বাড়ীতে দুইদিন বেড়ায় হাসান। তবে ভাবনা জুড়ে শুধুই সালমা। বাড়ীতে ফেরার পথে আবার পানি পানের নাম করে সালমাদের বাড়ীতে সালমাকে দেখার জন্য উঠার সিদ্ধান্ত নেয় হাসান। সালমা কোথায় লেখাপড়া করে যেভাবেই হোক এবার জানতে হবে হাসানকে।

পথিমধ্যে সালমাদের বাড়ীতে উঠে হাসান। প্রথমেই সালমাকে দেখতে পেয়ে হাসানের প্রেমিক মনে সাইরেন বেজে উঠে। হাসানকে অবাক করে দিয়ে সালমাই প্রথম বলে,ভাইয়া পানি খাবেন?
হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায় হাসান।

এই সময় সালমার মা হাসানকে দেখতে পেয়ে চিনতে পারে এবং কোথায় গিয়েছিল জিজ্ঞেস করে। হাসান জানায়, আমার বড় বোনের বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। রৌদ্রের তাপে অতিরিক্ত গরমে তৃষ্ণার কারনেই আপনাদের ডিস্টার্ব করছি চাচি।

সালমার মা এবার সালমাকে বলে ওরে পানি দে আগে, সুমনরে ডাক দিয়া ক গাছ থাইকা একটা ডাব কাটতে। পোলাডা অনেক দূরের পথ এই গরমে হেঁটে আসছে। মনে মনে খুশি হয় হাসান। এই সুযোগে সালমার সাথে কথা বলে সব জেনে নিতে পারবে।

সালমা মায়ের আদেশ পেয়ে ছোট ভাই সুমনকে ডাকে, বোনের ডাক পেয়ে সুমন দৌড়ে আসে, সালমা সুমনকে গাছে উঠে দুইটা ডাব কাটতে বলে। সুমন গাছ বেয়ে উঠতে থাকে।

হাসান সাহস করে সালমাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কোন ক্লাসে পড়?
চঞ্চল প্রকৃতির সালমা তাৎক্ষণাৎ উত্তর দেয়, আমি ক্লাস টেনে পড়ি, হাসেমপুর হাইস্কুলে।
সালমা এবার হাসানের পড়ালেখার খোঁজ নেয়, সব বিস্তারিত বলে হাসান।

সুমন ডাব কেটে আনার পর একটা ডাবের পানি খায় হাসান। আরেকটা ডাবের পানি খায় সুমন ও সালমা।

হাসান সালমাদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাড়ীর পথে রওয়ানা দেয়। সালমার মা বলে,
বোনের বাড়ীতে বেড়াতে আসলে, আমাদের বাড়ীতে উঠবা বাবা। কত দূরের পথ, রাস্তায় কিছু না খাইলে হাঁটাচলা করতে পারবা না ঠিকমতো।

জ্বি, চাচি আসবো বলে বাড়ী থেকে নামার পথে সালমার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট আওয়াজে হাসান জানায়,
তোমাদের স্কুলে আসবো আগামীকাল। তুমি স্কুলে অবশ্যই যাবা কিন্তু।

হাসানের কথা শুনে মুচকি হাসে সালমা।

বাড়ীতে ফিরে মায়ের সাথে বোনের ভালো মন্দ জানিয়েই হাসান জানায়,
আম্মা আমিই সবসময় আপাকে দেখতে এবং আনতে যাবো। আব্বাকে কষ্ট করতে হবে না আর।
হাসানের মা জামিলা বেগম ছেলের কথায় যারপরনাই বিস্মিত হয়। কিছু বলতে যাবে, এর আগেই হাসান ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

হাসানের ভাবনা জুড়ে শুধুই সালমা। আগামীকাল নিজের কলেজ কামাই দিয়ে সালমাদের স্কুলে যাবে হাসান। যেভাবেই হোক সালমার সাথে কথা বলে মনের কথা জানাতেই হবে, সিদ্ধান্ত নেয় হাসান।

সালমার ভাবনায় নির্ঘূম রাত কাটে হাসানের, ঘুমাতে চাইলেও সালমার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা ভেসে উঠে হাসানের সামনে।

শেষে রাতে ঘুম আসে হাসানের চোখে, তবে প্রেমিক দেহ প্রিয়তমার সাথে মনের কথা বলতে ব্যাকুল হয়ে থাকায় চোখে ঘুম আসলেও সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে হাসান। নাস্তা করে সালমাদের স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়। নিজের প্রিয় জিন্স ও টিশার্ট পড়ে হাসান। পাশের বাড়ীর বন্ধুদের ফুল বাগানে থাকা গোলাপ গাছ থেকে একটি লাল গোলাপ ছিড়ে নিজের পকেটে নিয়ে সালমাদের স্কুলের পথে রওয়ানা হয়।

দেড় ক্রোশ হেঁটে হাসেমপুর হাইস্কুলে পৌঁছে হাসান। দুপুর হয়ে এসেছে, একটু পরই টিফিনের সময় দেবে। এই সময়েই সালমার সাথে দেখা করবে হাসান। স্কুলের মেইন গেইটের পাশের দোকানে বসে হাসান। টিফিনের সময় হলে বাহিরে আসে সালমা। দোকানের সামনে আসতেই হাসানের সাথে দেখা হয়।

হাসানকে দেখে চমকে যায় সালমা। গতকাল আসবে বললেও এতো দূরের পথ হেঁটে হাসান যে সত্যিই আসবে ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবেনি সালমা। তবে নিজ থেকেই হাসানকে সালাম দিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করে সালমা।

হাসান সালামের জবাব দিয়ে সালমার সাথে একটু কথা আছে বলে স্কুলের পাশে নির্জন গাছের নিচে যাবার কথা বলে হাসান।

সালমা হাসানের মনের কথা বুঝতে পারে, তাই হাসানকে সুযোগ না দিয়ে সালমা নিজেই বলে,
আপনি যা চাইছেন তা হবে না ভাইয়া, আমার আব্বু আম্মু আমার বিয়ে ঠিক করে রেখেছে। আমার এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলেই আমার বিয়ে হয়ে যাবে। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।

Like Us On Facebook

Facebook Pagelike Widget
error: Content is protected !!